“করোনার বিশ্বায়ন: জনআকাঙ্ক্ষা ও শাসকশ্রেণির দ্বন্দ্ব”

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২০ |

ডা. মনোজ দাশ■

করোনাভাইরাস, এই একটি নামে কাঁপছে গোটা বিশ্ব। করোনা বিশ্বের প্রায় সব দেশের সীমানা অতিক্রম করে নিজেকে বিশ্বায়িত করেছে আপন ধ্বংসাত্মক গতিতে। মানুষের সব ভাবনা-দুর্ভাবনা করোনাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। পৃথিবী এমনটি আর কখনো দেখেনি। তাই করোনার আবির্ভাব এবং বিশ্বব্যাপী তার বিস্তার এক অভূতপূর্ব প্রপঞ্চের জন্ম দিয়েছে। করোনার অভিঘাতে মানুষের মনোজগতে উদ্ভব হয়েছে নতুন চিন্তাভাবনা ও লক্ষ্যের।

মানুষ তার জীবন-জীবিকা ও পরিবেশ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। করোনা ভয় তাকে স্তব্ধ করতে পারেনি। সামাজিক দূরত্ব ও বিচ্ছিন্নতার শ্লোগানকে মানুষ গ্রহণ করেনি। করোনা তার সামনে ‘দৈহিক দূরত্বে সামাজিক বন্ধন’ গড়ে তোলার শিক্ষা নিয়ে এসেছে। মানুষ উপলব্ধি করছে বিশ্বব্যাপী সহযোগিতা ও সম্পদের সুষম বণ্টন ছাড়া মানবজাতি অস্তিত্বের সংকটে পড়বে। করোনার বিশ্বায়ন একদিকে বিদ্যমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে, মানুষের মধ্যে বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রতি ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে, অন্যদিকে এটিকে পরিবর্তন করার তাগিদ মানুষ অনুভব করতে শুরু করেছে। শাসক শ্রেণির স্বার্থ ও গৃহীত ব্যবস্থার সাথে জন আকাঙ্ক্ষার দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে।

করোনার বিশ্বায়ন স্পষ্ট করেছে মানুষ ধর্ম-বর্ণ-দেশ ইত্যাদিতে বিভক্ত নয়। সব সমান। করোনা সীমান্ত মানেনি। করোনার বিশ্বায়নের মধ্যদিয়ে বিশ্বমানব হিসেবে মানুষ নিজেকে পুনঃআবিস্কার করেছে। জাতীয় সীমানার গণ্ডি অতিক্রম করে মানুষ আন্তর্জাতিকতা বোধে উদ্দীপ্ত হয়েছে। কিন্তু বৃহৎ পুঁজি নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রগুলি মানুষের মনোজগতের এই উল্লম্ফনের সাথে সংগতিপূর্ণ সাড়া দিতে পারেনি। যথার্থভাবে বিশ্ব প্রতিবেশির পাশে দাঁড়াতে পারেনি তারা। দুর্যোগে সদস্য রাষ্ট্রগুলির পারস্পরিক সহযোগিতার ধারা করোনার বিশ্বায়ন কালে স্পষ্ট না হওয়ায় মানুষের কাছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ব্যতিক্রম সমাজতান্ত্রিক দেশগুলি। করোনার মহাদুর্যোগে তারা জাতীয়তাবাদের প্রগতিশীল ধারায় সিক্ত হয়ে পশ্চিমকে আন্তর্জাতিকতাবাদ শিখিয়েছে। এটা নতুন নয়। কিন্তু করোনার বিশ্বায়ন কালে মানুষের মনে এটা নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

করোনা ধনী-গরিব, শাসক-শোষিতের পার্থক্য মানেনি। কিছুক্ষেত্রে করোনার বিশ্বায়ন যেন শ্রেণিবিভক্তি ঘুচিয়ে দিয়েছে। ক্ষণিকের জন্য শ্রেণি প্রশ্নকে আড়াল করে দিয়েছে। করোনা কাউকে ক্ষমা করছে না। সবাইকে এক কাতারে দাঁড় করিয়েছে। একদিক থেকে মৃত্যু সবাইকে সমান করে দিয়েছে। আবার এর উল্টোটা দেখা যাচ্ছে চিকিৎসা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে। মৃত্যুর পরেও ধনী-দরিদ্র বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মৃত্যুও সামাজিক বৈষম্যকে বহন করছে নানাভাবে। তাই শ্রেণিপ্রশ্ন ভিন্ন মাত্রায় মানুষের চেতনাকে নাড়া দিচ্ছে।

মুনাফা কবলিত পুঁজিবাদী শ্রেণি সংকীর্ণতা করোনার বিশ্বায়ন মোকাবিলায় আরো উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। দল-আদর্শ সব ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে করোনা মোকাবিলায় শাসক শ্রেণি সবাইকে একত্রিত করার চেষ্টা করেনি। শাসক পুঁজিপতি কেবল তার দল-ক্ষমতা আর মুনাফা দেখছে। মানুষের জীবনকে তারা অগ্রাধিকার দিতে পারেনি। মুনাফাসর্বস্ব বুর্জোয়া মানবিকতার স্বরূপ দেখছে মানব জাতি। আমাদের দেশে এর প্রতিফলন হয়েছে আরো নিকৃষ্ট বর্বরতার মধ্যে দিয়ে।

বিশ্বায়নের মাধ্যমে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলি ব্যাপক শোষণ-লুণ্ঠন ও মুনাফা অর্জনে সাফল্য লাভ করতে পারলেও করোনার বিশ্বায়নের আঘাত তারা মোকাবিলা করতে পারেনি। বিশ্বায়িত করোনা মহামারি তাদের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে শুধু প্রশ্নের সম্মুখীনই করেনি, গোটা ব্যবস্থাকে পরিবর্তনের চাপ সৃষ্টি করেছে। করোনা মোকাবেলায় পুঁজিবাদী দুনিয়া শুধু ব্যর্থই হয়নি, করোনার বিশ্বায়নে ব্যক্তি মালিকানার মুনাফাভিত্তিক পুঁজিবাদের দায়ও স্পষ্ট হয়েছে। মুনাফা প্রবণতাই করোনা বিস্তারের অন্যতম প্রধান কারণ। মানুষের মৃত্যু নিয়ে কর্পোরেট পুঁজির কোন ভাবনা নেই। লাভ-ক্ষতিই তাদের কাছে বড়। বছর শেষে ব্যালান্সশিটে টান না পড়লেই তারা খুশি।

করোনার বিশ্বায়ন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে, পুঁজিবাদে পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন সম্ভব নয়। করোনার বিশ্বায়ন প্রকৃতপক্ষে প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংসকারী মুনাফাসর্বস্ব আত্মঘাতি প্রবণতারই এক নিষ্ঠুর প্রতিফলন। রব ওয়ালেসের মত মহামারি বিশেষজ্ঞরা সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ করছেন, পুঁজিবাদের সংকট প্রকাশিত হয়েছে করোনার বিশ্বায়িত স্বাস্থ্য সংকট রূপে, কোথাও জীবনজীবিকার সংকটরূপে। পুঁজিবাদের পরিবর্তন না হলে এ অবস্থা ঘুরেফিরে চলতেই থাকবে। বৈশ্বিক করোনা মহামারি মানবজাতির কাছে এই সতর্ক বার্তা পৌঁছে দিয়েছে যে, সমাজ ও প্রকৃতির সঙ্গে ব্যক্তিমালিকানার মুনাফাভিত্তিক পুঁজির যে দ্বন্দ্ব, তার সমাধান ছাড়া পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের মধ্যদিয়ে মানব জাতিকে রক্ষা করা যাবে না। পুঁজিবাদের কাঠামো বজায় রেখে রোগ-বালাই প্রতিরোধ সক্ষম পরিবেশ সুরক্ষা সম্ভব নয়। ইকোলজিক্যাল সমস্যার প্রকৃত সমাধান করতে হলে পুঁজিবাদের পরিবর্তে সমাজতন্ত্রের প্রকৃতি ও সমাজ বিকাশের টেকসই বৈপ্লবিক ধারণার কাছে ফিরে যেতে হবে মানবজাতিকে। জগৎ সম্পর্কিত মানবীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তারীতির পুর্নবিন্যাস পুঁজিবাদের শোষণ-বৈষম্য-মুনাফা ও লুণ্ঠনবাদী মতাদর্শের মধ্যে সম্ভব নয়। তাই সামাজিক সম্পর্কের স্তরে তথা পুঁজিবাদী ব্যক্তি ও কর্পোরেট মালিকানার স্থলে সামাজিক যৌথ মালিকানার মানবিক বিশ্ব স্থাপনের মাধ্যমেই কেবল সমাজ ও প্রকৃতির সাথে পুঁজির দ্বন্দ্ব নিরসন সম্ভব হতে পারে।

অভূতপূর্ব ভাবে করোনার বিশ্বায়ন এক দমকা হাওয়ায় গোটা মানবজাতির বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গিতে বৈজ্ঞানিক পরিবর্তন এনেছে। কুসংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক কিছু ধর্ম প্রচারকের অদৃষ্টবাদের হাতছানিকে উপেক্ষা করে এবং এই প্রশ্নে সরকারগুলির দায়িত্বে অবহেলাকে অগ্রাহ্য করে মানুষ বিজ্ঞানের ওপরে আস্থা রাখছে। ভয়-সংকোচ ও দ্বিধা অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত মানুষ বিজ্ঞানের জয়যাত্রা কামনা করছে।

করোনার বিশ্বায়নের মাঝে জন মনস্তত্ত্ব ও জন আকাঙ্ক্ষার সাথে সংগতি রেখে সরকার কিছুই করতে পারেনি বাংলাদেশে। বরং অনেক দেশের মতোই করোনা মহামারি বিস্তারে বাংলাদেশের লুটেরা শাসকশ্রেণি নিয়ন্ত্রিত সরকারের দায় অনেক। সরকারের অদক্ষতা-অমনোযোগিতা-কালক্ষেপণ-সমন্বয়হীনতা ও জবাবদিহিতার অভাবে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। করোনা মোকাবেলায় সরকার ত্রিমুখী ব্যধিতে আক্রান্ত। প্রথমত, করোনা মোকাবিলা প্রশ্নে তাদের যুক্তি পুঁজিতান্ত্রিক স্বার্থতাড়িত। দ্বিতীয়ত, শাসক শ্রেণির স্বার্থে করোনার মধ্যে তারা পুঁজিবাদের আরেক রূপ নয়া উদারবাদী নিকৃষ্টমানের বর্বরতার স্বাক্ষর রেখেছে। তৃতীয়ত, করোনা মোকাবেলায় তারা আমলানির্ভর। শাসক দল দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। সরকার জনবিচ্ছিন্ন, জবাবদিহিতাহীন। করোনা মোকাবিলায় জনগণের জাতীয় ঐক্যে তাদের আস্থা নেই। জনগণকে নিয়ে বিন্দুমাত্র দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারেনি তারা। হুমকি-মামলা-গ্রেপ্তার, গণতন্ত্রহীনতা ফ্যাসিবাদি প্রবণতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাহীনতা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলছে। …তার পরেও সরকার প্রধান তার ওপর আস্থা রাখতে বলেছেন। এমন পরিস্থিতিতে ব্যক্তির কিছু ক্ষেত্রে অবদান রাখার সুযোগ আছে। তিনিও রাখতে পারতেন। কিন্তু আস্থা রাখার মতো কোনো দৃষ্টান্ত তিনি রাখতে পারেননি। আস্থা অর্জনের ঐতিহাসিক সুযোগ তিনি কাজে লাগাতে পারেননি। এর জন্য ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী একা দায়ী নয়। গণতন্ত্রহীন গোটা লুটেরা পুঁজিবাদী ব্যবস্থাই এর জন্য দায়ী। লুটেরা পঁজিবাদী ব্যবস্থাই বাংলাদেশের মহাবিপর্যয়ের আরেক নাম। করোনাভাইরাস ও লুটেরা পুঁজিবাদ নামক ভাইরাস পুষে রেখে জনআকাঙ্ক্ষার কল্যাণকর অর্থনীতিতো দূরের কথা, অর্থনীতির পুনরুদ্ধারও সম্ভব হবে না। করোনাকালের বাজেটে লুটেরাদেরই সুবিধা দেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ সীমিত। বাজেটে করোনাকালের জনপ্রত্যাশার প্রতিফলন নেই। জিডিপি ভিত্তিক লুটেরা উন্নয়নের প্রতারণার ফাঁদে মানুষকে আর আটকে রাখা যাবে না।

সারা বিশ্বের পুঁজিবাদী দেশগুলির মতোই করোনার বিশ্বায়নের মধ্যে শাসক শ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মকাণ্ডের সাথে জনমানুষের আকাঙ্ক্ষার তীব্র দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। আমাদের দেশসহ সারা দুনিয়ায় নতুন যুগের সংগ্রামের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। করোনা থেকে বেঁচে গেলে অসংখ্য মানুষ শুধু নিজের জন্য পরিচ্ছন্ন জীবনের পরিকল্পনাই শুধু করছে না, ব্যক্তি মালিকানাধীন সমাজের গুণগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সামাজিক মালিকানার মানবিক দুনিয়ার স্বপ্ন দেখছে। সর্বত্র গণশক্তিগুলি বিভিন্ন আকার, ফর্ম ও মাত্রায় আত্মপ্রকাশ করছে বা করার অপেক্ষায় আছে। আগের চেয়ে ভিন্ন এক উন্নত দুনিয়া সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই অবস্থার গুণগত পরিবর্তন হবে না। গণশক্তিগুলির প্রতিরোধ ও অগ্রাভিযান না থাকলে এ অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়। করোনা সৃষ্ট বিষয়গত পরিস্থিতি পরিবর্তনের শর্ত তৈরি করেছে। বিষয়গত শর্তকে কাজে লাগিয়ে নতুন দুনিয়া নির্মাণ করতে হবে বিষয়ীগত শক্তিকে। এই কাজে সামনের কাতারে থাকতে হবে বাম ও কমিউনিস্টদের।

করোনার বিশ্বায়ন বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতিতে, তার কাঠামোতে পরিবর্তনের সূচনা করতে বাধ্য হবে। অর্থনীতি ও রাজনীতিতে করোনার প্রভাব হবে ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারি। এটা শুধু চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেবে। বেকারত্ব বাড়বে। খাদ্য সংকটে ফেলবে মানুষকে। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের ব্যাপক সংকোচন হবে। রেমিটেন্স নির্ভর দেশগুলিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট দেখা দেবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নয়া মেরুকরণ হবে। আমাদের দেশ ও সারা বিশ্বে শেষ পর্যন্ত এটা আত্মপ্রকাশ করবে জন আকাঙ্ক্ষার সাথে শাসক পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থের দ্বন্দ্বরূপে।

বাংলাদেশের মানুষ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায় উন্মুখ হয়ে আছে। আওয়ামী লীগ দল হিসেবে অধঃপতিত, নিঃশ্বেষিত। বিএনপি মাঠে নেই। বামপন্থিদের প্রতি মানুষের আস্থা ও আগ্রহ বেড়েছে। এখন যতটুকু সম্ভব ও করোনা উত্তরকালে জনআকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে জনশক্তি গড়ে তুলে তাকে নেতৃত্ব দিতে পারলে করোনা সৃষ্ট নতুন দুনিয়া নির্মাণের বিষয়গত সম্ভাবনাকে বাস্তবে পরিণত করা সম্ভব হবে।

লেখক: বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, খুলনা জেলা কমিটির সভাপতি