শ্যামল দত্ত চট্টগ্রামকে নিয়ে ঠিক কোন চিন্তাটা করতে চান?

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২০ |

মুহাম্মদ মিজানুর রহমান ■

গত ৩ জুন দৈনিক ভোরের কাগজ পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ‘চট্টগ্রাম নিয়ে চিন্তা করার কেউ নেই’ শিরোনামে একটি আর্টিকেল প্রকাশিত হয়। এটার লেখক উক্ত পত্রিকার সম্পাদক শ্যামল দত্ত। চট্টগ্রামের নানা বিষয়ের বেহাল দশা ওঠে আসলেও জনাব দত্ত জোর দিতে চেয়েছেন অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় থাকা চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দিকে; পাশাপাশি প্রাসঙ্গিক হিসেবে তুলে এনেছেন ভালো মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অপ্রতুলতা, পর্যাপ্ত বিনোদন ব্যবস্থার অভাব এবং ঐতিহাসিক স্থানসমূহের অবহেলিত দৈন্যদশা।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ে পাঠকের অবকাশের জায়গা থাকবে না যে, রাজনীতিবিদ ও মন্ত্রীদের কথা সীমিত পরিসরে বললেও এসব কিছুর পেছনে প্রধান দায় তিনি দিতে চেয়েছেন চট্টগ্রামের ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের উপর। চট্টগ্রামের ১ কোটি মানুষের বিপরীতে করোনার জন্য আইসিউ বেড ১২ টি থাকার কারণ তিনি দেখেছেন ব্যবসায়ীদের এসব ক্ষেত্রে ব্যয় করার অনিচ্ছাকে; অথচ জনাব দত্ত এ প্রশ্নটি তুলেননি যে, বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য মন্ত্রণালয়-অধিদপ্তরসহ পৃথক পৃথক অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান থাকতে কেন ব্যবসায়ীদের এসব বিষয়ে প্রধান ভাবনাটা ভাবতে হবে।

জনাব দত্ত আক্ষেপের সাথে লিখেছেন, “চট্টগ্রামের নামকরা তিনটি হাসপাতাল- ইউএসটিসি গড়ে তুলেছিলেন ডাক্তার নুরুল ইসলাম, ইমপেরিয়েল হাসপাতাল গড়ে তুলেছেন ডাক্তার রবিউল হোসেন এবং একদল চিকিৎসক মিলে গড়ে তুলেছেন ম্যাক্স হাসপাতাল। ব্যবসায়ীরা পারেননি ল্যাবএইড, স্কয়ার কিংবা অ্যাপোলোর মতো উন্নতমানের হাসপাতাল গড়ে তুলতে।” আমার প্রথম আপত্তিটা হলো, শ্যামল দত্ত চট্টগ্রাম নিয়ে যে চিন্তাটা করতে চান, সেখানে কি প্রাইভেট হাসপাতালের ছড়াছড়ি থাকবে এবং টাকাওয়ালাদের জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত হবে? এখানে উল্লেখ্য যে, চট্টগ্রামের প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে এখন পর্যন্ত চিকিৎসাসেবা প্রদান শুরু হয়নি।

তাছাড়া প্রাইভেট হাসপাতাল মালিকদের সিন্ডিকেটের দুর্ভেদ্য দেওয়ালের সামনে ব্যবসায়ীগোষ্ঠী কতটা অসহায় এবং এ-ব্যাপারে প্রশাসনের কী ভূমিকা থাকা প্রয়োজন, সে-আলোচনায় তিনি না গিয়ে সম্পূর্ণ দায়টা ব্যবসায়ীদের উপরে চাপিয়েছেন। এছাড়া হতদরিদ্র মানুষদের পক্ষে প্রাইভেট হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়াটা যে, মোটেও সহজ কিছু নয়, এ ব্যাপারটিও তার আলোচনায় অনুপস্থিত। চট্টগ্রামেই হোক কিংবা সারাদেশে, চিকিৎসা পাঁচটি মৌলিক অধিকারের মধ্য অন্যতম হলেও হতদরিদ্র মানুষদের স্বাস্থ্য অধিকারের অপর্যাপ্ততা নিয়ে তবে কে ভাববে?

শ্যামল দত্ত লিখেছেন, “চট্টগ্রামে ভালো একটি বিনোদন কেন্দ্র নেই, একটি ভালো পর্যটন কেন্দ্র নেই। একটি উন্নত, আধুনিক ও স্বাস্থ্য আর শিক্ষায় সমৃদ্ধ শহর গড়তে এই রাজনৈতিক-ব্যবসায়ীগোষ্ঠীর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি কখনো।” বেহাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পাশাপাশি বিনোদন ও পর্যটন কেন্দ্রের অপ্রতুলতার দায়ও তিনি রাজনৈতিক-ব্যবসায়ীগোষ্ঠীর উপরেই দিয়েছেন অনেকটা। অথচ স্বাধীন বাংলাদেশকে পর্যটকদের কাছে বিশ্বের অন্যতম পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের সংবিধানে ১৪৩ নং আদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটি ১৯৭৩ সাল থেকে দেশের একমাত্র সরকারি পর্যটন সংস্থা হিসাবে যাত্রা শুরু করে। এছাড়া পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা ও দেখভালের জন্য বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড নামের আলাদা একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানও আছে। জনাব দত্ত বাংলাদেশ সরকারের এই আলাদা দুটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে অবগত ছিলেন না নাকি সম্পূর্ণ দায় ব্যবসায়ীগোষ্ঠীর উপর তুলে দেওয়ার স্বার্থে ইচ্ছাকৃতভাবে তিনি ব্যাপারটা এড়িয়ে গেছেন, তা তিনিই জানবেন।

শ্যামল দত্তের অভিযোগ এখানেই শেষ হয়নি। জেএম সেন হল, সূর্যসেনের আবক্ষ মূর্তি, প্রীতিলতার স্মৃতিবিজড়িত ইউরোপিয়ান ক্লাব, জালালাবাদ যুদ্ধের স্মৃতির মিনার, মুসলিম ইনস্টিটিউট হল কিংবা আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের হেডকোয়ার্টার সিআরবি চরম অবহেলায় পড়ে থাকার পেছনে তিনি দায় দেখেছেন এ অপরাধী ব্যবসায়ীগোষ্ঠীর। প্রতœতাত্তি¡ক নিদর্শন ও ঐতিহাসিক স্থানসমূহের সংস্কার-সংরক্ষণের জন্য বাংলাদেশ প্রত্নতাত্তি¡ক অধিদপ্তরসহ অনেক প্রতিষ্ঠান আছে। এদের পাশ কাটিয়ে কীভাবে দায়টা একমাত্র ব্যবসায়ীদের উপরেই আসে, তা জনাব দত্তই ভালো জানবেন। ব্যবসায়ীদের ভাগ্য একটা জায়গায় অন্তত সুপ্রসন্ন যে, চাক্তাই খাল খননের কাজ কখনো শেষ না হওয়া, রাস্তাঘাটের যথাযথ উন্নয়ন না হওয়া, পাহাড়-কাটা না থামা, বিমানবন্দর থেকে চট্টগ্রাম শহরে যেতে অপরিসীম যানজট সংকটের সমাধান না হওয়া, অপরিকল্পিতভাবে ফ্লাইওভার নির্মাণ হওয়ার ফলে যানবাহনের জটের সমস্যার অবসান না হওয়া ও ফ্লাইওভারের মধ্যেই পানি জমে থাকার পেছনে তিনি দায় দেখেছেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম ওয়াসার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবের মধ্যে; এখানে অন্তত তিনি রাজনৈতিক-ব্যবসায়ীগোষ্ঠীকে দায় দেননি।

চট্টগ্রামকে জনাব দত্ত অভিধিত করলেন একটি ‘মৌলবাদী, ধর্মীয় গোঁড়া ও উগ্রবাদী চিন্তার চর্চা’র কেন্দ্র হিসেবে। এ প্যারার ঠিক পরের লাইনে তিনি উল্লেখ করেছেন, “কবিয়াল রমেশ শীল, কবি আলাওল, আব্দুল

করিম সাহিত্যবিশারদের চট্টগগ্রাম কিংবা মাস্টারদা সূর্যসেন ও বীরকন্যা প্রীতিলতার চট্টগ্রাম, ভারতীয় উপমহাদেশে সাহিত্য-সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র চট্টগ্রাম- কেন এমন একটি সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় হানাহানির কদর্য চেহারা নিয়েছে এটা ধারণা করা চিন্তাশীল মানুষের পক্ষে কঠিন।” অবশ্য তিনি কীসের ভিত্তিতে চট্টগ্রামকে মৌলবাদী ও উগ্রবাদী চিন্তা চর্চার কেন্দ্র কিংবা সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় হানাহানি জায়গা হিসেবে অভিহিত করেছেন, তা উল্লেখ করেননি। বলাটা প্রাসঙ্গিক যে, গত বছরের শেষ দিকে ভোলার বোরহানউদ্দিনে সাম্প্রদায়িক একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে কওমিপন্থীরা নিদারুণ সংঘর্ষ ঘটালেও কওমিদের প্রধান প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রামের হাটাহাজারী আল-জামিয়তুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম মাদ্রাসা পার্শ্বস্থ হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রার্থনাস্থল একটি মন্দিরকে পাহাড়া দিতে দেখা যায় উক্ত মাদ্রাসার ছাত্রবৃন্দকে। এত সুন্দর দৃশ্য নিশ্চয় পৃথিবীতে প্রায় বিরল।

তবে সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় যে কদর্য হানাহানির কথা জনাব দত্ত জোর দিয়ে বলেছেন, তা সারাদেশ থেকে শুরু করে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারত- কোথাও মোটেও বিরল নয়। এর কিছুটা আঁচ হয়তো চট্টগ্রামে থাকতে পারে; কিন্তু তাই বলে চট্টগ্রামকেই ধর্মীয় হানাহানির কদর্য চেহারা সম্বলিত নগরী হিসেবে অভিহিত করা নিরেট বাড়াবাড়ি। জনাব দত্তের আনিত এ বিশেষ অভিযোগ তথা ‘চট্টগ্রামের এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যে’র পেছনে কী কারণ আছে, তা বের করার প্রয়োজন হিসেবে তিনি এটিকে সমাজবিজ্ঞানীদের গবেষণার খোরাক হিসেবে উল্লেখ দেখেছেন। তবে একই প্যারায় তিনি ব্যক্তিগতভাবে যে কারণটা দেখিয়েছেন, তা হলো, “চট্টগ্রামের এই সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ ধনাঢ্য সম্প্রদায়, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক সমাজ চট্টগ্রামের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, শিক্ষা সংস্কৃতি ও ব্যবস্থায় নজর না দেয়া।

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা ও পীরের মুরিদ হওয়ার পেছনে যতটা আগ্রহী, ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ভালো হাসপাতাল নির্মাণের ব্যাপারে তেমন আগ্রহী নয়।” এ জায়গায় আমি দুটি শব্দদ্বয়ে পাঠকবর্গকে সুক্ষ্ম দৃষ্টি রাখতে অনুরোধ জানাবো- ‘মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা’ ও ‘পীরের মুরিদ হওয়া’। অর্থাৎ, জনাব দত্ত হয়তো চট্টগ্রামকে মৌলবাদ, ধর্মীয় গোঁড়া ও উগ্রবাদী চিন্তার চর্চা কেন্দ্র হিসেবে দেখেছেন এ দুটি কারণে। ইসলাম ধর্ম নিয়ে যাদের নূন্যতম জানাশোনা আছে, তারা নিশ্চয় জেনে থাকবেন, ইসলামে সূফিপন্থীরা ‘পীরের মুরিদ হওয়া’তে বিশ্বাসী ও এটিকে তারা ধর্মচর্চা হিসেবেই মানেন এবং এখন পর্যন্ত এ ধর্মচর্চাকে কোনো প্রগতিশীল ব্যক্তি মৌলবাদ বা ধর্মীয় গোঁড়ামি হিসেবে দেখেননি। তাহলে কি জনাব দত্ত সূফিপন্থীদের ধর্মচর্চাকে ধর্মীয় গোঁড়া বা উগ্রবাদী চিন্তাচর্চা হিসেবে দেখেছেন? মজার বিষয় হলো, এর পরের প্যারায় তিনি চট্টগ্রামকে ‘বারো আউলিয়ার শহর, মাইজভান্ডারীর শহর, সুফি, মুর্শিদি, কবিয়ালের শহর’ হিসেবে আখ্যায়িত করে সূফিপন্থিদের স্তুতিতে ভাসিয়েছেন। জনাব দত্তের এ দ্বিচারিতা কীসের প্রয়োজনে, তা তিনিই ভালো জানবেন। 

উপরের প্যারায় শ্যামল দত্তকে কোট করা অংশে খেয়াল করলে আরেকটি বিষয় পাঠকবর্গের দৃষ্টিগোচর হবে। জনাব দত্ত হয়তো মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠাকে ‘ভালো মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান’ প্রতিষ্ঠার অন্তরায় হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন। তিনি কোন মনোভাব বা কীসের ভিত্তিতে মাদ্রাসাকে ভালো মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে রাখতে চান, তা তিনিই জানেন। তবে পাঠকের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি, বাংলাদেশে আলিয়া মাদ্রাসাগুলো বহুদিন ধরে বিতর্কহীনভাবে শিক্ষাসেবা দিয়ে আসছে। কওমি মাদ্রাসারগুলোর ব্যাপারে আগে যে খানিক বিতর্ক ছিল না বা এখনও যে নেই, সে-ই ব্যাপারটাকে অস্বীকারের জো নেই; তবে সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার কওমি মাদ্রাসাগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়ার খবরও নিশ্চয় সকলেরই জানা। কীসের ভিত্তিতে তবে মাদ্রাসাগুলোকে জনাব দত্ত ভালো মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে রাখেন? খানিক বিতর্ক আছে, এ দাবির ভিত্তিতে যদি এমনটা তিনি করেন, তাহলে তো অনেক নামীদামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও খানিক বিতর্কের ভিত্তিতে ভালো মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা থেকে বাদ পড়ে যাবে! তবে কি তিনি সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকেই মাদ্রাসাসমূহের উপর এ বিরূপ দৃষ্টিভঙ্গি রাখেন?

শ্যামল দত্তের ব্যাপারে আমার শেষ অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুতর। তিনি লিখেছেন, “পাকিস্তানের এক পীর প্রতি বছর শুধুমাত্র চট্টগ্রামেই আসেন এবং তাকে নিয়ে চট্টগ্রামের দলমত নির্বিশেষে সব রাজনৈতিক ব্যবসায়ী নেতার মধ্যে বাড়াবাড়ি রকমের যে কদর্য প্রতিযোগিতা- তা একেবারেই দৃষ্টিকটু পর্যায়ের।” তিনি ‘পাকিস্তানের এক পীর’ আখ্যায়িত করে সরাসরি একজন ধর্মীয় সাধকের দিকে অভিযোগের তীর তাক করেছেন। কোনো ধর্মীয় সাধককে ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে মাপতে পারেন কিনা, সে-প্রশ্নটা রেখে গেলাম পাঠক ও জনাব দত্ত সমীপে। বাংলাদেশে ইসলাম এনেছে সূফি-সাধকরা এবং তাদের কেউই এদেশের স্থানীয় নয়। তারা হয়তো এসেছেন আরব থেকে, না হয় ইরাক-ইরান-ইয়েমেন থেকে। সে-সূত্রধরে পাকিস্তান হতে বাংলাদেশে কোনো পীর-সাধক আসাটা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। জনাব দত্ত নিজেই সূফিধারাকে স্তুতিতে ভাসিয়েছেন, আগে উল্লেখ করেছি বিষয়টা। পাকিস্তান শব্দটি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে একটি বিশ্রী অনুভূতির জায়গায় থাকার সত্তে¡ও ঠিক কী উদ্দেশ্যে তিনি একজন ধর্মীয় সাধককে ‘পাকিস্তানের এক পীর’ বলে আখ্যা করবেন, তাও তিনিই জানেন। তবে নির্দিষ্ট কোনো ধর্মীয় সাধককে নির্দেশ করে এবং কোনো ব্যক্তিবিশেষের সে-পীরের পেছনের আবেগকে ‘বাড়াবাড়ি রকমের কদর্য প্রতিযোগিতা’ আখ্যায়িত করা যায় কিনা, সে-প্রশ্নটা গাঢ় হয়ে ওঠে। এখানে যে আবেগকে তিনি কদর্য বাড়াবাড়ির প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখেছেন, সে-আবেগ কেবল ইসলামধর্মীয় পীর নয়; হিন্দুধর্মীয় পুরোহিত, খ্রিস্টানধর্মীয় পোপ ও বৌদ্ধধর্মীয় ভিক্ষুকে ঘিরেও দেখা যায়। বলাটা বাহুল্য নয় যে, যে-ব্যবসায়ী নেতাবর্গের বিপক্ষে তিনি ‘পীরকে নিয়ে কদর্য বাড়াবাড়ি প্রতিযোগিতার’র অভিযোগ আনতে চেয়েছেন, একটু খোঁজ খবর নিলে দেখা যাবে, তারা মরমী গানের পেছনে নির্মোহ ও অলাভজনক বিনিয়োগ করছেন এবং নিজেদের অর্থায়নে মুজিববর্ষ উপলক্ষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অনন্য সৌন্দর্য শাটল ট্রেনসমূহকে অপরূপ সাজে রঙিন করে দেওয়ার কথাও ছিল। কদর্য বাড়াবাড়িটা তিনি শুধু নির্দিষ্ট পীরকে নিয়ে কেন দেখলেন, তা আমার জানার কথা না। এছাড়া উক্ত পীরকে নিয়ে ঠিক কী ধরণের বাড়াবাড়ি, সেটাও তিনি পরিষ্কার করেননি। পীর বা পীরের অনুসারীদের তিনি সাজাতে চেয়েছেন মৌলবাদী, ধর্মীয় গোঁড়া ও উগ্রবাদী হিসেবে; অথচ চট্টগ্রামের মাইজভান্ডারের সৈয়দ সাইফুদ্দীন মাইজভান্ডারী ডাক্তারদের প্রয়োজনে পিপিই প্রদান ও প্রায় এক লক্ষ নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারকে খাদ্যসামগ্রী প্রদান করেন এবং পীর হাসান মাইজভান্ডারী ফটিকছড়িতে নিজের প্রতিষ্ঠিত একটি মাদ্রাসাকে সম্প্রতি করোনা আইসোলেশন সেন্টার হিসেবে ব্যবহারের জন্য দিয়েছেন, করোনায় মৃত্যবরণকারী লাশ দাফনের প্রয়োজনে এগিয়ে এসেছেন গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ ও আল মানাহিল ফাউন্ডেশন একঝাঁক সেচ্ছাসেবক সমেত। ধর্মীয় সংগঠনগুলোর এ ধরণের নির্মোহ অবদান করোনাকালীন সময়ে শুধুমাত্র দৃষ্টিগোচর হয়েছে ‘উগ্রবাদী চিন্তা চর্চার কেন্দ্র’। তাই, এখানে একজন পাঠক হিসেবে আমি যে তাড়না অনুভব করি তা হলো, জনাব দত্ত চট্টগ্রামকে নিয়ে ঠিক কোন চিন্তাটা করতে চান, তা পরিষ্কার করা জরুরি। তিনি কি চট্টগ্রামকে মাদ্রাসা ও ধর্মচর্চামুক্ত কোনো শহর হিসেবে দেখতে চান?

শুধু চট্টগ্রাম নয়, সমগ্র বাংলাদেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থার খুবই বেহাল দশা। এর পেছনে ব্যবসায়ীগোষ্ঠীর খানিকটা হলেও মানবিক ও নৈতিক দায়িত্ব নেই বললে অসত্য বলা হবে। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার আলোচনাকে পাশ কাটিয়ে এবং এর প্রধান কারণকে এড়িয়ে চলে, গত তিন দশকের গণতান্ত্রিক সরকারসমূহের পর্যাপ্ত দায় না দেখিয়ে, কেবল ব্যবসায়ীগোষ্ঠীর উপর সম্পূর্ণ দায় চাপিয়ে দিলে এর পেছনে একটি শব্দই কেবল ওঠে আসে এবং তা হলো, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। দশ লাইনের সত্য কথার সাথে যখন এক লাইন মিথ্যাও চলে আসে, তখন তা আর পুরোপুরি সত্য থাকে না। এক বাটি গরুর দুধের সাথে যখন ভুলেও এক ফোটা মূত্র মিশে যায়, তখন সেটা দেখতে হয়তো গরুর দুধই থাকে, কিন্তু তা আর পান করার যোগ্য থাকে না। শ্যামল দত্তের উত্থাপিত ইস্যুটি নিশ্চয় প্রশংসিত, কিন্তু তিনি যে-পন্থায় সেটা বর্ণনা করেছেন, তা একটি প্রথম সারির পত্রিকার সম্পাদক পর্যায়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তির অদায়ীত্বশীল আচরণের মধ্যে পড়ে কি না, সে-প্রশ্নটাও উঠে আসে। তবে শ্যামল দত্তের এ ধরণের অযাচিত মন্তব্য এটিই প্রথম নয়। কোনো এক অজানা কারণে তাঁকে প্রায় এ ধরণের অযাচিত মন্তব্য করতে দেখা যায়। করোনার প্রকোপ শুরুর প্রথম দিকে একাত্তর টিভির একটি লাইভ অনুষ্ঠানে তিনি কোনো রকম বৈজ্ঞানিক রেফারেন্স ছাড়া করোনায় মৃত্যুবরণকারী লাশকে দাহ করার পক্ষে মত দিয়েছেন। ইসলাম ধর্মীয় একটি বিধানকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে ন্যূনতম বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছাড়া এমন মন্তব্য নিঃসন্দেহে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের দিকে ইঙ্গিত দেয়।

জনাব দত্তের কাছে আমার সর্বশেষ অনুরোধ, আপনি কি অনুগ্রহপূর্বক পরিষ্কার করবেন যে, চট্টগ্রামকে নিয়ে ঠিক কোন ভাবনাটা আপনি ভাবতে চান?

লেখক: সহ-প্রকাশনা সচিব, হিজরি নবর্বষ উদযাপন পরিষদ, চট্টগ্রাম।