সম্পাদকীয়

কলকাতা টিভি চতুর্থ স্তম্ভ চিন্তিত নাকি স্তম্ভিত?

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ |

তৈমুর মল্লিক, উপ-সম্পাদক ■ বাংলাদেশ প্রেস

কলকাতার সংবাদ পাঠিকা বা সাংবাদিকদের ধারাবর্ণনা সবসময়ই বেশ হৃদয়গ্রাহী হয়ে থাকে। সেই দিক থেকে সংবাদ পাঠিকা সুচন্দ্রিমা পিছিয়ে নেই। 

বেশ রশিয়ে, জমিয়ে তিনি চীন নামক দেশটিকে কাবুলিওয়ালা চরিত্রের সাথে মিলাতে গিয়ে বেশ খানিকটা নাটকীয় হয়ে উঠলেন। না, তিনি খুব যে ভুল কিছু বলেছেন সেটা বলিনি, বলতে চেয়েছি তিনি যা বলেছেন সেখানে চীনের বিপক্ষে যে স্ক্রিপ্ট ছিলো সেই স্ক্রিপ্টের নির্যাসে ছিলো বাংলাদেশ। তিনি হয়তো চীনকে বিশ্বব্যাপী ঋণদাতা ও ঋণ আদায়ে দখলদার বানাতে গিয়ে অভিনয়ের পাল্লটা একটু ঝুঁকিয়ে দিয়েছিলেন বাংলাদেশের দিকে। আর তাই চীনকে নিয়ে তিনি আফ্রিকা হয়ে পাকিস্তান নেপাল ভূটান শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমার ঘুরে সবার শেষে চলে এলেন বাংলাদেশে।

তার সংবাদ পরিবেশনের ১ম দিকে ভাবছিলাম তিনি হয়তো সরাসরি বাংলাদেশেই প্রবেশ করবেন। কিন্তু না, তিনি সংবাদ পাঠের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতি ভারতের যে কন্ট্রিবিউশান সেটা বেশ রশিয়ে রশিয়ে তুলে ধরার জন্য সংবাদের শেষ অংশই বেছে নিলেন। এবং শেষ করলেন বাংলাদেশকে সামনে রেখে তার নিজের দেশের সরকারের প্রতি ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে। তখন বুঝতে পারলাম যে, সুচন্দ্রিমা বাক্যের গঠনপ্রণালী বেশ বুদ্ধিদীপ্ত ভাবেই উল্টিয়ে দিয়ে সাবজেক্ট নিয়ে গেলেন সবার শেষে। হয়তো তিনি বুঝতে পারেননি, নিজের অজান্তেই বাংলাদেশকে তিনি ভারতের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বের স্থানে রেখেছেন। এমনকি পাকিস্তান তাদের চিরশত্রু, যারা পারমাণবিক শক্তিধর - তাদেরকেও বাংলাদেশ প্রশ্নে গোনার মধ্যেই নেননি।

যাইহোক, সুচন্দ্রিমা চীনকে নিয়ে চিন্তিত কারণ পাকিস্তানের চেয়ে অনেক বেশি মাথা ব্যাথার কারণ তাদের নিকট চীন। আঞ্চলিক ক্ষমতা ধরে রাখতে ভারতের জন্য তার চিন্তা হওয়াটাই স্বাভাবিক। এই ক্ষেত্রে তাদের চিন্তা যা খুশি তাই হোক, তাতে কিছু যায় আসেনা। কিন্তু প্রশ্নহলো কেন এতো চিন্তা এখন? 

চীন কোথায় কত অর্থ বিনিয়োগ করেছে, সেই অর্থ পরিশোধ করতে না পারলে চীন সেখানে কোন ব্যবস্থা চালু করেছে এসব তথ্য তুলে ধরে আসলে কলকাতা টিভি কি বোঝাতে চেয়েছে? 

একলাইনে যদি বলি - চীন বিপুল অর্থ লগ্নি করে, ঋণের বোঝা চাঁপিয়ে দিয়ে সেই দেশের শিল্প, ভূখণ্ড ইত্যাদি দখল করবে তাইতো? এটাতো শুধু চীনের স্ট্রাডেজি নয়, এটা বিশ্বের যে কোন দেশের স্ট্রাডেজি। বাংলাদেশ সেই স্ট্রাডেজির চাপ কতটা বহন করতে পারবে, কতটা পারবে না সেটাতো বাংলাদেশের ব্যাপার তাইনা? তাহলে সেটা বোঝাতে গিয়ে সুচন্দ্রিমা যেভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছে, তাতে মনে হয়েছে বাংলাদেশের সক্ষমতা আর কেউ জানুক না জানুক তিনি সেটা জানেন। 

তিস্তা নিয়ে এতো ভাবনা না দেখিয়ে হয়তো উচিত ছিলো বছরের পর বছর এই তিস্তার পানির হিস্যা কেন দেয়া হয়নি, সেখানেই বড় ভুল ছিল কিনা সেটা ভেবে দেখা। 

তবে তিস্তার ব্যাপার নিয়ে যতনা চিন্তিত তার চেয়ে বেশি চিন্তিত যে শিলিগুড়ি এবং সেভেন সিস্টারের কমপক্ষে ৫ সিস্টার নিয়ে সেটা আমরা বুঝতে পেরেছি।

তবে হ্যা, সুচন্দ্রিমা সব কথা যে ভুল বলেছে এমন নয়। ভারত আমাদের বন্ধু, নাগরিক যাতায়াত রয়েছে অবাধ। এটুকু অন্তত ঠিক। যে দেশের সাথে সীমান্ত সংযোগ প্রায় ৪১০০ কিলোমিটার সেই দেশের সাথে এই বন্ধুত্ব এই নাগরিক যাতায়াত থাকবেই। পৃথিবীর সকল সীমান্তবর্তী দেশের তাই আছে। কিন্তু তারপর?

কোলকাতা টিভি আজ চিন্তিত রংপুরের অদূরে তাদের প্রায় অরক্ষিত সীমান্ত শিলিগুড়ি নিয়ে । তাদের ভাবনায় রয়েছে বাংলাদেশ যদি এখন তিস্তার পানি রিজার্ভ করতে নিজেদের এলাকায় বাঁধ নির্মান করে চীনের সহযোগিতায় তাহলে সেখানে চীনের আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েন হবে এবং তারা ধীরে ধীরে শিলিগুড়ির দিকে অগ্রসর হবে । ভারত এমনিতেই নেপাল, পাকিস্তান সিমান্ত নিয়ে দিশেহারা অন্যদিকে যদি বাংলাদেশের সাথে সংযুক্ত সীমানায় নিজেদের অবস্থান পাকা করতে পারে তাহলেতো লেজে গোবরে হয়ে যাবে ।

তাহলে আমরা বলতে পারিকি যে, বছরের পর বছর পানির অভাবে বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চল প্রায় মরুভূমির দিকে ধাবমান হচ্ছিলো, তখন কোথায় ছিলো এই ভাবনা ? বাংলাদেশ এখন তার সীমানায় ডিফেন্স নেয় তখন কেন এতো চিৎকার ?

সুচন্দ্রিমা অবশ্য তার নিজের দেশের সরকারকে বেশ করে বকে দিয়েছে এই বলে যে, তাদের অনেক স্বার্থের যোগান দাতা বাংলাদেশ বেহাত হতে চলেছে সেদিকে কোন খেয়ালই নেই । তিনি বাংলাদেশের উন্নয়নে ভারতের অনেক কিছুই দেবার কথা বলেছেন- কিন্তু তাদের দেশের বৈদেশিক আয়ের সিংহভাগ যায় বাংলাদেশ থেকে সেটা হয়তো ভুলেই গেছেন । বাংলাদেশের ভূখন্ড না পেলে তাদের সেভেন সিস্টার ও উলফাকে ধরে রাখা কতযে কষ্টের সেটাও বলেন নি , কিন্তু বাংলাদেশকে বেশ ছোট করে দেখে আবার প্রাধান্য দিতে কৃপনতা করেনি ।

শেখ হাসিনা এখন বাংলাদেশের সরকার প্রধান । সন্দেহাতীত ভাবে ভারতের মিস্টার মোদি হতে অনেক বেশি দক্ষতা তিনি রাখেন সেটা আমরা বিশ্বাস করি । তিনি চাইলে কাকে কতটা নাচাতে পারেন সেটা কলকাতা টিভির চিন্তা দেখেই বোঝা গেছে । তাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কি হবে সেটা কলকাতা টিভি'র সুচন্দ্রিমা হতে অনেক বেশি বোঝেন তাতে সন্দেহ থাকার কথা নয় । বাংলাদেশ প্রশ্নে উদ্ভট তথ্য সম্বলিত সংবাদ পরিবেশন করে যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা দেখলাম সেটা সাংঘাতিক ভাবে স্তম্ভিত হয়ে পড়ার একটি বহিঃপ্রকাশ । 

আমরা তাই বলি, স্তম্ভীত না হয়ে , প্রভূত্ব চরিত্র না রেখে সত্যি যদি বন্ধুত্ব আচরন প্রকাশিত হয় তাহলে হয়তো আর কোন সমস্যা হবার কথা নয় । 

তবে আমরা এটুকু বুঝতে পেরেছি- শেখ হাসিনার একটি দাবার চাল ভারতকে এতটাই নাড়িয়ে দিতে পারে - যা পাকিস্তান চীন পারমাণবিক বোমা দিয়েও করতে পারবে না । আর তাই উচিৎ প্রভুত্ব নয় সত্যিকার বন্ধু হবার চিন্তা মাথায় রাখা । চোখে আঙুল দিয়ে কোন কিছু নির্দেশ করার আগে নিজেদেরটাও দেখানো উচিৎ। না দেখালেও সমস্যা নেই- কারন ইতিহাসের সব খবরই বাংলাদেশের মানুষ খুব ভালো করেই রাখে। 

কলকাতা টিভির সুচন্দ্রিমা নিশ্চই আর্টিকেলটা পড়বেন, এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে কোন চালাকি বা অভিনয় না করে সরাসরি বন্ধুত্বের জন্য এগিয়ে আসবেন ।