জেলা সংবাদ

টানা বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম, নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০১৯

নিজস্ব প্রতিবেদক ■ বাংলাদেশ প্রেস

আষাঢ়ের শেষ দিকে এসে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম মহানগরীর অনেক নিচু এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ২৪ ঘণ্টায় ১৩৬ মিলিমিটার টানা বৃষ্টিতে এসব এলাকার প্রধান সড়কগুলো ডুবে যায়। গতকাল সোমবার নগরীর অনেক নিচু এলাকার বাসাবাড়ি, দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ে। যান চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় অফিসগামী মানুষ এবং শিক্ষার্থীরা পড়ে চরম দুর্ভোগে।


আবহাওয়া অফিস টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের আশঙ্কা করলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে অনেক বাসিন্দাকে সরিয়ে নেওয়ায় বড় কোনো বিপর্যয় ঘটেনি।


দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় ৩ নম্বর সতর্কতা সংকেতের কারণে সাগর উত্তাল। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে জাহাজ থেকে পণ্য ওঠানো-নামানো বন্ধ ছিল। মাছ ধরার কোনো নৌকা বা ট্রলার উপকূল থেকে সাগরে যায়নি।


চট্টগ্রামে মৌসুমি এই বৃষ্টিপাত শুরু হয় গত শনিবার থেকে। রবিবার কখনো থেমে থেমে, কখনো মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছে। তবে রবিবার দুপুর ১২টা থেকে গতকাল দুপুর ১২টা পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ১৩৬ মিলিমিটার। 


পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ প্রদীপ কান্তি রায় বলেন, ‘পুরো দেশের ওপর মৌসুমি বায়ু প্রবলভাবে সক্রিয় রয়েছে। এ কারণে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় ভারি বর্ষণ হচ্ছে। আজ মঙ্গলবারও ভারি বর্ষণ হতে পারে। আর ভারি বর্ষণের কারণে চট্টগ্রাম বিভাগের কোনো কোনো পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে।


নগরীর পাহাড়ি এলাকায় ঝুঁকিতে থাকা লোকজনকে সরিয়ে নিতে গত শনিবার আটটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। রবিবার রাত থেকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত এসব আশ্রয়কেন্দ্রে সাড়ে তিন শ পরিবার আশ্রয় নিয়েছে বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রশাসন সজাগ আছে। আমাদের পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় মাইকিং এবং উচ্ছেদ কার্যক্রম চলছে। নগরীর আটটি আশ্রয়কেন্দ্রে পরিবার নিয়ে পাহাড় থেকে অনেকে আসছে। তাদের জন্য শুকনা খাবারসহ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কৈবল্যধাম বিশ্ব কলোনি, চন্দ্রনগর, চৌধুরীনগর এবং ১, ২ ও ৩ নম্বর ঝিলপাড় এলাকায় পাহাড়ে বসতি স্থাপনকারীদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।’


দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্কতা সংকেত বহাল রয়েছে। সাগর উত্তাল থাকায় গতকাল চট্টগ্রাম থেকে কোনো লাইটার জাহাজ বহির্নোঙরে পণ্য খালাস করতে যায়নি।


জানতে চাইলে শিপ হ্যান্ডলিং ও বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এ কে এম সামশুজ্জামান রাসেল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বহির্নোঙরে পণ্য খালাস পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ৩২টি জাহাজ পণ্য নিয়ে বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ রয়েছে। তবে বন্দরের ভেতর জেটি ও টার্মিনালে জাহাজ থেকে খোলা জাহাজে পণ্য ওঠানো-নামানোয় ব্যাঘাত ঘটলেও কনটেইনার জাহাজ থেকে পণ্য ওঠানো-নামানো পুরোপুরি স্বাভাবিক ছিল।


টানা বৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি পানি জমেছে নগরীর প্রবর্তক মোড়, দুই নম্বর গেট, মুরাদপুর, কাপাসগোলা, বাদুরতলা ও শুলকবহর এলাকায়। এ ছাড়া বাকলিয়া, কাতালগঞ্জ, হালিশহর, আগ্রাবাদ সিডিএ ও চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার নিচু এলাকায় বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে।


নগরীর প্রধান সড়ক মুরাদপুর থেকে ষোলশহর এবং দুই নম্বর গেটে জলাবদ্ধতার কারণে গতকাল যান চলাচল প্রায় এক ঘণ্টা বন্ধ থাকে। গাড়ি নিয়ে এই পথ দিয়ে চলতে গিয়ে আটকা পড়ে অফিসগামী যাত্রীরা। অবশ্য জলাবদ্ধতার খবর পেয়ে এই সড়ক এড়িয়ে অনেকে মুরাদপুর-লালখানবাজার পর্যন্ত আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার দিয়ে চলাচল করে। পরে সেখানেও পানি জমে যাওয়ায় চলাচলে সাময়িক বিঘ্ন ঘটে।


টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম ওয়াসা মোড়ে জলাবদ্ধতার কারণে ওয়াসা ভবনের নিচে পানি ঢুকে পড়ায় নিচতলার অফিস সাময়িক বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ ছাড়া নির্মাণাধীন ভবনেও পানি জমে যাওয়ায় পাম্প মেশিন দিয়ে পানি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানান চট্টগ্রাম ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম হোসেন।


গতকাল সকালে চট্টগ্রাম মেডিক্যালে রোগী দেখতে যাওয়ার পথে প্রবর্তক মোড়ে জলাবদ্ধতায় আটকা পড়েন অধ্যাপক শিপলু হোসেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে খুলশীর বাসা থেকে বের হয়েছি সকালে। প্রবর্তক মোড়ের আগে এসে এমন পরিস্থিতিতে পড়েছি, এদিক-ওদিক সরতে পারছিলাম না। পরে ট্যাক্সি থেকে নেমে হেঁটে যাওয়ার চেষ্টা করলে দেখি কোমর সমান পানি। এ অবস্থায় বাধ্য হয়ে বাসায় ফিরে যাই।’


টানা বৃষ্টিতে আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকাও জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের নিচতলায় পানি জমে গেলে রোগীরা চরম দুর্ভোগে পড়ে। এতে হাসপাতালের চিকিত্সাব্যবস্থা ব্যাহত হয়।


চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি শৈবাল দাশ সুমন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নগরীর অনেক এলাকায় পানি জমেছে। আমি সরেজমিনে অনেক এলাকায় গিয়েছি। বেশির ভাগ এলাকায় হাঁটু পরিমাণ পানি। প্রবর্তক-কাপাসগোলার দিকে কোমর সমান পানি জমেছে। কয়েকটি এলাকা থেকে দেয়াল ও গাছপালা ভেঙে পড়ার খবর পেয়েছি। আমাদের সিটি করপোরেশনের টিম মাঠে কাজ করছে।’