জেলা সংবাদ

স্কুল ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচীতে পিস্তল উঁচিয়ে গুলি করার হুমকি-৪ জনের বিরুদ্ধে সদর থানায় মামলা!!

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০১৯

উজ্জ্বল রায়, নড়াইল জেলা প্রতিনিধি ■

সোমবার(১৭ জুন) ২৭৪: নড়াইল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচিতে মারপিটসহ পিস্তল নিয়ে হামলার ঘটনায় চার জনের নামে নড়াইল সদর থানায় মামলা নং (৬)। ওই স্কুলের সাবেক ছাত্র জাকারিয়া খান বাদী হয়ে সোমবার (১৭ জুন) বিকালে মামলাটি দায়ের করেছেন।

মামলার আসামীরা হলেন পিস্তল নিয়ে হামলাকারী ঠিকাদার রেজাউল আলম ওরফে জার্মানী আলম, কামরুল আলম, জোয়ের হোসেন দুখু ও ঠিকাদার মঈন উল্লাহ দুলু। নড়াইল সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক প্রদেশ কুমার মল্লিককে এক অভিভাবক কর্তৃক লাঞ্ছিতের প্রতিবাদে রবিবার ছাত্ররা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে শান্তিপুর্ণভাবে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করছিলো। এসময় ওই অভিভাবকসহ আসামীরা কোমলমতি ছাত্রদের ওপর চড়াও হয় এবং মারধর করে ও পিস্তুল উঁচিয়ে গুলি করার ভয় দেখায়। এসময় ছাত্ররা ভয়ে দৌড়ি পালিয়ে যান। নড়াইল সদর থানার ওসি ইলিয়াস হোসেন পিপিএম, আমাদের নড়াইল জেলা প্রতিনিধি উজ্জ্বল রায়কে জানান, গতকাল রবিবার ঠিকাদার রেজাউল আলমের অস্ত্রটি জমা নেয়া হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। আসামীদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

উল্লেখ্য, নড়াইল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান শিক্ষক প্রদেশ কুমার মল্লিকে অভিভাবক কর্তৃক লাঞ্ছিতের প্রতিবাদে নড়াইল-যশোর সড়ক অবরোধ করে ছাত্রদের বিক্ষোভ সমাবেশ ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালিত হয়েছে। এসময় অভিযুক্ত অভিাবকের পক্ষ থেকে ছাত্রদের উপর হামলা ও মারধোর করা হয়েছে বলে ছাত্ররা অভিযোগ করেন। রবিবার সকাল ১০ টায় নড়াইল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে বিদ্যালয়ের ছাত্রদের আয়োজনে কর্মসূচি পালিত হয়।

গত ১৫ জুন সকালে শিক্ষক প্রদেশ কুমার মল্লিক তার প্রাইভেট কোচিং এ এক ছাত্রীকে মারধোর করে। এ ঘটনা বাড়িতে বললে ঐ ছাত্রীর পিতা স্থানীয় ঠিকাদার মঈনউল্লাহ দুলু ঐ শিক্ষককে বাড়ি থেকে কলার ধরে টেনে হিচড়ে বের করে নিয়ে আসে। এ ঘটনা জানাজানি হলে ছাত্ররা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা শিক্ষককে লাঞ্ছিতের ঘটনায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও ও নড়াইল- যশোর সড়ক অবরোধ করে। এ সময় জেলা প্রশাসকের চত্বরে অভিযুক্ত অভিাবকের পক্ষ থেকে ছাত্রদের উপর হামলা ও মারধোর করা হয়েছে বলে ছাত্ররা অভিযোগ করেন। একঘন্টা সড়ক অবরোধের পর প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ছাত্রদের স্কুলে ফেরত পাঠানো হয় এবং শিক্ষকদের সাথে বৈঠক করেন। ছাত্ররা রাস্তা ছেড়ে গেলেও স্কুলের গেটে বিক্ষোভ অব্যহত রাখে। তারা অবিলম্বে শিক্ষকের উপর হামলাকারী ঠিকাদার মোঃ মইনউল্লা দুলুর দুলুকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

শিক্ষক প্রদেশ মল্লিক জানান, শনিবার সকালে তার ভাড়ার বাসায় শিক্ষাথীদের প্রাইভেট পড়ানোর সময় সপ্তাহিক পরীক্ষা নেয়ার সময় ঠিকাদার মোঃ মইনউল্লা দুলুর মেয়ে শানজিনা এরিনা খাতায় নাম না লিখে জমা দেয়, খাতায় নাম লেখোনি কেন, এ প্রশ্ন করলে সে খাতা আমার সামনে ছুড়ে ফেলে দেয় এবং বাড়ী থেকে তার বাবাকে ডেকে নিয়ে আসে । তিনি এসে আমার সাথে শিক্ষাথীদের সামনে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটায়। এ ব্যাপারে প্রশাসনের সাথে বসে এ প্রীতিকর ঘটনার সমাধান হয়েছে।

ঠিকাদার মোঃ মইনউল্লা দুলুর দুলু বলেন,শনিবার সকাল ৬টার সময় শিক্ষক প্রদেশ মল্লিকের বাড়ীতে আমার মেয়ে প্রাইভেট পড়তে যায়, কিছু সময় পরে সে কান্না করতে করতে বাড়ী ফিরে আসে, তার কাছে ফিরে আসার কারণ জানতে চাইলে সে পিট দেখিয়ে বলে স্যার আমাকে মেরেছে, তখন আমি স্যারের বাড়ী গিয়ে স্যারকে পুলিশে দেয়ার জন্য ঘর থেকে বের করে নিয়ে আসি, আমি তাকে মারধর করিনি, পরে রাস্তায় এলে পরিচিত কয়েকজন তাকে ছেড়ে দেয়ার কথা বললে আমি তাকে ছেড়েদি। পরে আমার বড় ভাইদের নিয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সাথে দেখা করি এবং ঐ শিক্ষকের সাথে ঘটে যাওয়া বিক্ষিপ্ত ঘটনার অবসান ঘটে। এ অবস্থায় কিছু অছাত্র বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভ’ল বুঝিয়ে এ সব করায়। পরে জেলা প্রশাসকের সাথে বসে ঐ শিক্ষকসহ সকলে বসে এর সুষ্ঠ সমাধান হয়ে গেছে। জেলা প্রশাসক আনজুমান আরা, জেলা প্রশাসকের চত্বরে হামলার ঘটনা অস্বীকার করে বলেন, এ সময় দু-পক্ষের মধ্যে বাক-বিকন্ডা হয়েছিল। পরে আমরা দু-পক্ষকে ডেকে এর সুষ্ঠ সমাধান করেছি।

এদিকে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচীতে পিস্তল উঁচিয়ে গুলির হুমকি দেয় এক ঠিকাদার! এ সময় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এতে অভিভাবকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ বিস্ময় প্রকাশ করেন। এমনকি অবস্থান কর্মসূচী পালনকালে অন্তত ১০জন ছাত্রকে মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

নড়াইল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ভূক্তভোগী শিক্ষক প্রদেশ মল্লিক জানান, গত শনিবার (১৫ জুন) সকালে তার বাসায় শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়ানোর সময় পড়ালেখা নিয়ে সানজিনা এরিনা নামে এক ছাত্রীকে শাসন করেন তিনি। এরিনা বিষয়টি বাড়িতে গিয়ে তার বাবা শহরের মহিষখোলার ঠিকদার মঈন উল্লাহ দুলুকে জানায়। এরপর ওই ছাত্রীর বাবা বাসায় এসে শিক্ষককে মারধর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সানজিনা এরিনা নড়াইল সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী হলেও নড়াইল সরকারি উ”চ বিদ্যালয়ের (বালক) শিক্ষক প্রদেশ মল্লিকের কাছে প্রাইভেট পড়ত।

বিষয়টি জানাজানি হলে নড়াইল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা ওই অভিভাবকের বিচার দাবিতে রোববার সকালে সড়ক অবরোধ ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরে অবস্থান কর্মসূচী পালন করে। এ ঘটনায় ওইদিন (রোববার) সকালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, অভিযুক্ত অভিভাবক ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা আলোচনা বসে বিষয়টি মিমাংসা করেন। তবে ডিসি অফিস চত্বরে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের ওপর হঠাৎ করে চড়াও হয় অভিযুক্ত অভিভাবক মঈন উল্লাহ দুলুর লোকজন। এ সময় নড়াইল শহরের মহিষখোলার ঠিকাদার রেজাউল আলমসহ তার অনুসারীরা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের তাড়া করে মারধরে উদ্যত হন। এক পর্যায়ে রেজাউল আলম পিস্তল বের করে ছাত্রদের গুলি করার জন্য এগিয়ে যান। এতে শিক্ষার্থীরা আতঙ্কিত হয়ে ছুটোছুটি শুরু করে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা আনজুমান আরা ঠিকাদার রেজাউল আলমকে পিস্তল বের না করার অনুরোধ করেন। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচীতে পিস্তল উঁচিয়ে গুলি করার হুমকিতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গণমাধ্যমকর্মীসহ উপস্থিত সবাই আতঙ্কিত হয়ে দিক-বিদিক ছুটোছুটি শুরু করেন। এ ঘটনায় অভিভাবকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ হতবাক হয়ে পড়েন। ঘটনাটি এখন ‘টক অব দ্যা টাউন’-এ পরিণত হয়েছে। এ ব্যাপারে ঠিকদার রেজাউল আলম সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে চাননি। তবে পিস্তলটি লাইসেন্সকৃত বলে দাবি তার।

এদিকে অভিযুক্ত অভিভাবক মঈন উল্লাহ দুলু ভূক্তভোগী শিক্ষক প্রদেশ কুমারকে মারধরের বিষয়টি অস্বীকার করেন। জেলা প্রশাসক আনজুমান আরা বলেন, দুইপক্ষকে ডেকে বিষয়টি মিমাংসা করা হয়েছে। এছাড়া ঠিকাদার রেজাউল আলমের পিস্তলটি সদর থানায় জমা রাখা হয়।