রাজনীতি

যেসব কারণে কপাল পুড়ল নাছিরের

প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২০ |

নিজস্ব প্রতিনিধি ■ বাংলাদেশ প্রেস

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনে মেয়র পদে নৌকার প্রার্থী হিসেবে রেজাউল করিম চৌধুরীকে বেছে নিয়ে বড় ধরনের চমক দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এবার দলের মনোনয়ন ফরম নেওয়া দেড় ডজন প্রার্থীর মধ্যে ছিলেন বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনও। ছিলেন সাবেক মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি, সাবেক মেয়র এম মনজুর আলম ও সাবেক সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম। এত হেভিওয়েট প্রার্থীর মধ্যে তেমন আলোচনায় ছিলেন না রেজাউল করিম চৌধুরী। কিন্তু আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ড আস্থা রাখল তার ওপরই।

মনোনয়ন পেয়ে আনন্দিত রেজাউল বলেন, নির্বাচিত হলে তিনি চট্টগ্রামকে একটি পরিকল্পিত নগর হিসেবে গড়ে তুলবেন। একই সঙ্গে দলীয় কোন্দল দূর করে নগর আওয়ামী লীগকেও বাঁধতে চান এক সুতোয়। রেজাউলের এই স্বপ্ন পূরণে সহায়তা করবেন বলেও ঘোষণা দিয়েছেন বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির। তবু নাছিরের বাদ পড়াকে কোনোভাবেই মানতে পারছেন না তার অনুসারীরা। তাদের বদ্ধমূল ধারণা ছিল, মেয়র পদে ফের নাছিরের ওপর আস্থা রাখবেন নেত্রী।
নাছিরের মনোনয়নবঞ্চিত হওয়া নিয়ে নগরজুড়ে চলছে চুলচেরা বিশ্নেষণ। চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগে বিভক্তি,  অন্তঃকোন্দলের পেছনে মূলত নাছিরকেই দায়ী করা হয়। ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিলের ভোটে জয়ী হয়ে মেয়র হন নগর আওয়ামী লীগের এই সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু গত পাঁচ বছরে তার নানা কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ ছিলেন প্রধানমন্ত্রী।

দেশে সব সিটি মেয়রকে তাদের পদবি অনুযায়ী মর্যাদা দিলেও নাছিরকে সেই মর্যাদা দেওয়া হয়নি। কারণ মেয়র নির্বাচিত হয়ার পর থেকে নগর আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রয়াত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে বিরোধ বাড়তে থাকে নাছিরের। যার প্রভাব পড়ে মহানগর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের রাজনীতি বিভক্ত হয়ে পড়ে নাছির ও মহিউদ্দিন বলয়ে। দলের সহযোগী ও অঙ্গ সংগঠনের রাজনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে থাকে।
দলীয় কোন্দলের জেরে গত পাঁচ বছরে নগরে নিজেদের মধ্যে খুন হয়েছেন অন্তত পাঁচ ছাত্রলীগ নেতাকর্মী। তাদের মধ্যে আছেন- সিটি কলেজের ছাত্রলীগ নেতা সুদীপ্ত, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা নাসিম আহমেদ সোহেল, চবি ছাত্রলীগ নেতা দিয়াজ ইরফান, পাহাড়তলীর ছাত্রলীগ নেতা সোহেল ও আরেক ছাত্রলীগ নেতা মেহেদি হাসান বাদল।

নাছিরের ওপর এবার আস্থা না রাখার আরও কিছু কারণ আলোচিত হচ্ছে চট্টগ্রামে। এর মধ্যে আছে আওয়ামী লীগের বিভাগীয় প্রতিনিধি সভার মঞ্চ থেকে মহিউদ্দিন চৌধুরীর স্ত্রী হাসিনা মহিউদ্দিনকে নামিয়ে দেওয়ার ঘটনাও। গত বছর অক্টোবরে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত ওই প্রতিনিধি সভায় মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী মঞ্চে ডেকে নেন হাসিনা মহিউদ্দিনকে। কিন্তু মঞ্চের সিট প্ল্যানে হাসিনা মহিউদ্দিনের নাম না থাকায় আ জ ম নাছির তাকে নামিয়ে দেন। বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী নেতাকর্মীরা। ঘটনাটি জানাজানির পর থেকে ক্ষোভে ফেটে পড়েন তারা। কোথাও ট্রাকবহর নিয়ে, কোথাও পদযাত্রার মাধ্যমে মিছিল করে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন তারা। বিষয়টি কেন্দ্র পর্যন্ত গড়ায়। এ নিয়ে মেয়র নাছিরের সঙ্গে তখন কথাও বলেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। মেয়র নাছিরও এটি ভুল বোঝাবুঝি বলে পরে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

নগরের সব এমপির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়াও কাল হয়েছে নাছিরের জন্য। নগরের এমপিদের সঙ্গে এক সময় খুব সখ্য ছিল তার। কিন্তু মেয়র হওয়ার পর দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে প্রথমে দূরত্ব তৈরি হয় নাছিরের। এর পর নগরের অন্য এমপিদের সঙ্গেও বিরোধে জড়ান তিনি। আবার মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর নাছিরের বন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসা সম্প্রসারণ ও গৃহায়নের এক প্রকৌশলীকে চড় মারার বিষয়টিও নাছিরকে বিতর্কিত করেছে বলে মনে করেন রাজনীতিবিদরা।

এমইএস কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি হাবিবুর রহমান তারেক বলেন, মেয়র হিসেবে অনেক উন্নয়ন করেছেন নাছির। কিন্তু দল পরিচালনা করতে গিয়ে তার কিছু সিদ্ধান্ত বিতর্কিত হয়েছে। কোন্দলের কারণে নিজেদের মধ্যেই খুন হয়েছেন হাফ ডজন নেতাকর্মী। হয়তো এ কারণে এবার তার ওপর আস্থা রাখেনি দল। বর্তমানে যাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, সেই রেজাউল করিম অত্যন্ত সজ্জন ও আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ। তার এই মনোনয়নে আমরা তৃণমূলের নেতাকর্মীরা অনেক খুশি।

বাদ পড়ার কারণ জানতে চাইলে তা এড়িয়ে গিয়ে আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী যা ভালো মনে করেছেন, যাকে যোগ্য মনে করেছেন, তাকেই মনোনয়ন দিয়েছেন। রেজাউল করিম চৌধুরী তৃণমূল থেকে উঠে আসা একজন পরীক্ষিত রাজনীতিবিদ। আমাদের সবাইকে এক হয়ে বিজয়ী করতে হবে নৌকার এই প্রার্থীকে। প্রধানমন্ত্রীর ভালোবাসা আমিও পেয়েছি। তৃণমূল থেকে আমাকেও তুলে এনে মেয়র করেছেন তিনি। দিয়েছেন নগরের সাধারণ সম্পাদকের পদও।'

অন্যদিকে মনোনয়ন পেয়ে সবাইকে চমকে দেওয়া নগরে নৌকার নতুন মাঝি রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী আস্থা রাখায় আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ। আমাদের সবাইকে মিলেমিশে কাজ করে দলের বিজয় নিশ্চিত করতে হবে। চট্টগ্রামকে আমি একটি পরিকল্পিত নগর হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। দলের মাঝে ফেরাতে চাই ঐক্যও।'