রাজনীতি

নাঈমকে নেতা বানানোয় ক্ষোভ আওয়ামী লীগে

প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০১৯     আপডেট: ১৯ নভেম্বর ২০১৯

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ■ বাংলাদেশ প্রেস

ঢাকা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগ উত্তরের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন বিমানবন্দর ও আশকোনা এলাকার ত্রাস হিসেবে পরিচিত আনিসুর রহমান নাঈম। যার বিরুদ্ধে জমি দখল, চোরাকারবারি, চাঁদাবাজি, অত্যাচার-নির্যাতনের অনেক অভিযোগ আছে। স্থানীয়রা বলছেন, নাঈম বিতর্কিত এসব কাজ করে সম্পদশালী হয়েছেন রাজনৈতিক।

 পরিচয় ব্যবহার করেই। এমন পরিস্থিতিতে তার ঢাকা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগ উত্তরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা হওয়ায় আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরাই হতাশ হয়েছেন। হতাশ বিমানবন্দর ও আশকোনা এলাকার সাধারণ মানুষও। তারা বলছেন, নাঈমের নেতা হওয়া আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শুদ্ধি অভিযানকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। স্বেচ্ছাসেবক লীগের এ সম্মেলনের আগে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলো সম্মেলনে যারা নেতা হয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে এত এত বিতর্ক নেই।

বিমানবন্দর ও আশকোনা এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নাঈমের নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। জমি দখলে তার মতো কৌশলী আর কেউ নেই। দখলের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি মামলা আছে আদালতেই (নালিশি মামলার নম্বর ৪৯৩৯/১৯৯৮, বাদী সাঈদা আখতার পপি। মামলা নাম্বার পিপি ১৭২৪/২০০২ বাদী সাজেদা বেগম। দেওয়ানি মোকদ্দমা ৬৩২/২০১১, বাদী রফিউদ্দিন)। থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও (উত্তরা থানায় জিডি নাম্বার ১৫৬০/২০০১) রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, সাহসী কয়েকজন মামলা করলেও অনেকেই আছেন মামলা করার ঝমেলায় জড়ান না। বিমানবন্দরে চোরাকারবারিতেও নাঈমের জড়িত থাকার অভিযোগ আছে। অত্যাচার-নির্যাতনে তার বাহিনীর কোনো জুড়ি নেই। চাঁদাবাজি তার পেশা এমন আলোচনাও আছে আশকোনা এলাকায়। ফুটপাত, রিকশার গ্যারেজ ও অটোরিকশার মালিক-শ্রমিকদেরও চাঁদা দিতে হয় তাকে। রাজনীতিই সম্পদশালী করে তুলেছে তাকে। যে সম্পদের জোরে নাঈম এখন ঢাকা উত্তর ৪৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর। নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভোট করে কাউন্সিলর হন তিনি।

এমন পরিস্থিতিতে নাঈমের নেতা হওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। দেশ রূপান্তরকে তারা বলেন, নাঈমের নেতা হওয়ার ভেতর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুর্নীতিবিরোধী অভিযান প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ‘ক্লিন ইমেজের’ মানুষকে নেতা বানানোর যে অঙ্গীকার করা হয়েছে আওয়ামী লীগের শীর্ষপর্যায় থেকে বারবার সেটা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

স্বেচ্ছাসেবক লীগ উত্তরের এক সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, এই নাঈমের নামে স্মাগলিং, জমি দখল থেকে শুরু করে হেন কোনো অপরাধ নাই যাতে তার সম্পৃক্ততা নেই। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে উত্তরার বহু সাধারণ মানুষ নাঈমের দ্বারা নির্যাতিত-নিপীড়িত। বহুবার সংবাদের শিরোনামও হতে হয়েছে তাকে। সেই নাঈমেরই স্বেচ্ছাসেবক লীগ উত্তরের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়া হতাশ করেছে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যারা রাজনীতি করার স্বপ্ন দেখেছিলেন তাদেরকে।

এমন পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে আনিসুর রহমান নাঈম তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগই অস্বীকার করেন, বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র চলছে। এসব অভিযোগের তদন্ত করেন আপনারা। দেখবেন সবই ভিত্তিহীন।’

আওয়ামী লীগের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলটির অন্য সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের অনেকেই নাঈমের নেতা হওয়ার বিস্মিত হয়েছেন। দেশ রূপান্তরকে তারা জানিয়েছেন, নাঈম স্বেচ্ছাসেবক লীগের মতো সহযোগী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়ার মধ্য দিয়ে দলের ভেতরের শুদ্ধি অভিযান সন্দেহের মুখে পড়েছে। তারা বলেন, এমন পরিস্থিতিতে কারা শুদ্ধি অভিযান প্রশ্নবিদ্ধ করতে চান তাদের খুঁজে বের করা উচিত।

স্বেচ্ছাসেবক লীগের গত কমিটির এক সাংগঠনিক সম্পাদক  বলেন, ‘বিতর্কিতরা নেতা হতে পারবেন না এ ঘোষণা আমাদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল। আমাদের ভেতরে অনেকেই আবার রাজনীতি করার সুযোগ পাবেন এই স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন। নাঈমের মতো বিতর্কিত নেতারা পদ পেলে সেই আত্মবিশ্বাস-স্বপ্ন আর টেকে না। কথা রাখেননি আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় নেতারা এমন কথাও বলছেন অনেকেই।’

কৃষক লীগ ও শ্রমিক লীগের নতুন সভাপতির বিরুদ্ধে কিছুটা অভিযোগ থাকলেও তা নেতাকর্মীরা মেনে নিয়েছেন। কিন্তু ঢাকা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগ উত্তরে নাঈমের নেতা হওয়ার বিষয়টি অনেকেই মেনে নিতে পারছেন না। শুদ্ধি অভিযান নিয়ে আস্থা হারিয়েছেন সাধারণ কর্মীরা। তারা বলেন, সম্রাটরা গ্রেপ্তার হবে আবার নাঈমরা নেতা হবে এটা হতে পারে না। কারণ সম্রাট-নাঈম এরা মুদ্রার এপিট-ওপিট। সম্রাটরা হারিয়ে গেলে নাঈমরাই গডফাদার হবে। এদের মধ্যে কোনো তফাত নেই।

স্বেচ্ছাসেবক লীগের গত কমিটির সহসভাপতি পদের এক সদস্য বলেন, ত্যাগী, পরিচ্ছন্ন ও মেধাবী নেতারা রাজনীতি করার সুযোগ পাবেÑ এই ভেবে সিলেকশনে নেতা হওয়ায় এ পদ্ধতিকে সাধুবাদ জানানো হয়েছে। কর্মীদের ভেতরে আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে এ পদ্ধতিতে। কারণ গোঁজামিলের বা সিন্ডিকেটের কোনো নেতার পদ পাওয়ার সুযোগ থাকবে না। নাঈমের নেতা হওয়ার মধ্য দিয়ে সিলেকশন পদ্ধতিও বিতর্কিত হয়ে গেল। আওয়ামী লীগের সিলেকশন পদ্ধতিতে নেতা নির্বাচন নিয়ে সাধারণ নেতাকর্মী ও সমর্থকদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। একটা কথাই তারা বলছেন, কথা রাখেনি আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের রাজনীতি করার স্বপ্ন দেখিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেননি। সহযোগী সংঠনগুলোর নেতাদের দাবি, বিতর্কমুক্ত নেতাদের রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়ার কথা আওয়ামী লীগের শীর্ষপর্যায় থেকে বারবার ঘোষণা করা হলেও কার্যত তার উল্টোটাই করেছে আওয়ামী লীগ।

স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ ও শ্রমিক লীগের গত কমিটির মধ্যমসারির নেতারা বলছেন, কোনো বিতর্কিত নেতাকে পদ দেওয়া হবে না বলে ঘোষণা দেওয়া হলেও ঠিকই বিতর্কিতরাই সহযোগী সংগঠনের পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। স্বেচ্ছাসেবক লীগের উত্তরের সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান নাঈমকে নেতা বানিয়ে বিতর্কিতদের রাজনীতিতে আসার নজির স্থাপন করেছেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা।