রাজনীতি

শোভন-রাব্বানী কান্ডে ছাত্রলীগে তোলপাড়

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০১৯

নিজস্ব প্রতিনিধি ■ বাংলাদেশ প্রেস

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে পবিত্র কোরআন খতম ও দোয়া মাহফিলের আয়োজনের পোস্টারে ছেয়ে গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক। তবে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ বলছে, এই পোস্টার ও অনুষ্ঠানের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের পোস্টারে সব সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি ব্যবহার হলেও ওই পোস্টারে তাদের ছবি ছিল না। বিতর্কের মুখে পড়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে বৃহস্পতিবার আয়োজিত অনুষ্ঠান বাতিল করেছে ছাত্রলীগ। অনুষ্ঠানে পবিত্র কোরআন খতম ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন ছিল তাদের।

সমালোচকরা বলছেন, পোস্টারটি করা হয়েছে সস্তা জনপ্রিয়তা আর বাহবা পাওয়ার আশায়। ছাত্রশিবির ও খেলাফত মজলিসের আদলে ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর সম্মতিতেই তা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, পোস্টারের কোথাও নেই বঙ্গবন্ধু বা শেখ হাসিনার ছবি। যে পোস্টারের অনুষ্ঠানে দাওয়াতের অতিথি হিসেবে নাম আছে জামায়াতপন্থিদেরও।

ছাত্রলীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা এ প্রসঙ্গে বলেন, শুধু বাহবা কুড়ানোর আশায়ই এমন একটি বিতর্কিত অনুষ্ঠানের আয়োজক হয় বঙ্গবন্ধুর ছাত্রলীগ। কেন্দ্রীয় কমিটিতে আলোচনা না করেই সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের ইচ্ছায় হুট করে এ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে।

আলোচিত ওই পোস্টার নিয়ে দুই-তিন দিন সমালোচনার পর গত মঙ্গলবার ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে অনুষ্ঠান বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হয়। একই প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এ ধরনের পোস্টার করা ও অতিথিদের দাওয়াতের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে বিষয়টি নিয়ে ছাত্রলীগের অন্য কেন্দ্রীয় নেতারা বলেছেন, পোস্টারটি সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের জ্ঞাতসারেই হয়েছে। তারা এখন ‘উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে’ চাপাতে চাইছেন।

ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি পর্যায়ের এক সদস্য বলেন, শুধু এই অনুষ্ঠানই নয়, কোনো ব্যাপারেই সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের বাইরে আর কেউ তেমন অবহিত থাকেন না। শীর্ষ দুই নেতার কয়েকজন আস্থাভাজন এই কাজগুলো করেন।

‘রাজনীতি করি বলে কোনো কিছু না জেনেই উপস্থিত থাকতে হয় অনুষ্ঠানগুলোতে’ ক্ষোভের সুরে বলেন তিনি।

কেন্দ্রীয় কমিটির এক সম্পাদক বলেন, কিছুদিন আগে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী সভাপতি শোভনকে বলছিলেন, ধর্মীয় অনুষ্ঠানটা করেই ফেলতে হবে। সেখানে অনেক কেন্দ্রীয় নেতা উপস্থিত থাকলেও কারও সঙ্গে সে বিষয়ে শেয়ার করা হয়নি।

তিনি বলেন, শুধু এই অনুষ্ঠানই নয়, কোনো ব্যাপারেই শীর্ষ পদে থাকা দুইজনের কেউই অপর সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা-পরামর্শ করেন না। ফলে ভুলত্রুটি অনেক ক্ষেত্রেই হচ্ছে।

ছাত্রলীগের আরেক সম্পাদক বলেন, পোস্টারটি নিয়ে আমাদের ফেইসবুক গ্রুপে যেসব আলোচনা হয়েছে তাতে অনেকেই তীব্র সমালোচনা করেছেন। কেউ কেউ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে বাহবাও দিয়েছেন। তবে বেশিরভাগ নেতাই সমালোচনা করেছেন। কিন্তু তা আমলে নেননি শোভন-রাব্বানী।

তিনি বলেন, আমার জানা মতে পোস্টার ও অনুষ্ঠান আয়োজনের ব্যাপারে সভাপতি অনেকটাই অন্ধকারে ছিলেন। সাধারণ সম্পাদকই সব দেখভাল করেছেন। সেক্ষেত্রে সভাপতির খুব একটা দোষ নেই। তবে এ ধরনের একটি আয়োজনে সভাপতির দায় এড়ানোর সুযোগও নেই।

সহ-সভাপতি পর্যায়ের আরেক সদস্য আক্ষেপ করে বলেন, সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের দেখাও পাই না আমরা। একাধিকবার ফোন দিলেও যোগাযোগ করতে পারি না তাদের সঙ্গে।

পোস্টারের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি শাহরিয়ার কবির বিদ্যুৎ বলেন, আগস্ট এলেই মুক্তিযোদ্ধের বিপক্ষের শক্তিগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে থাকে। ছাত্রলীগ যেহেতু আওয়ামী লীগের অন্যতম এটি ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠন, তাই তারা ছাত্রলীগকে বিতর্কিত করতে চায়। তবে আমরা তা হতে দেব না। আমরা তদন্ত করে এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেব।

এদিকে মঙ্গলবার ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী বলেন, এটা যারা করেছে অতি উৎসাহী হয়ে করেছে। এর সঙ্গে ছাত্রলীগের কোনো সম্পর্ক নেই।

তিনি বলেন, আমাদের সভাপতির কাছে এক দল কওমি ছাত্র এসেছিলেন। তারা শোক দিবস উপলক্ষে একটা প্রোগ্রাম করতে চায় জানালে সভাপতি তাদের প্রোগ্রাম করার রোডম্যাপ চান। কিন্তু তারা সেটা না করে অতি উৎসাহী হয়ে পোস্টার ছাপিয়েছে। আমরা তাদের ডেকেছি। রাতে তাদের সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত জানাব।

ওই পোস্টারে বলা হয়, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, মহান স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৪তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে আগামী ২২ আগস্ট বৃহস্পতিবার দুপুর ২টায় রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে পবিত্র কুরআন খতম, হামদ-নাত পরিবেশনা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। পোস্টারের নিচে লেখা আছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। সভাপতিত্ব করবেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন। সঞ্চালনা করবেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। প্রধান অতিথি ধর্ম প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শেখ মো. আব্দুল্লাহ। কুরআন তিলাওয়াত করবেন বিশ্বজয়ী হাফেজ ও কারি শায়খ আহমাদ বিন ইউসুফ আল আজহারী, সাইদুল ইসলাম আসাদ, তাওহিদ বিন আলী লাহোরি, সাইফুল ইসলাম আল হুসাইনি, তরিকুল ইসলাম, সাইফুর রহমান তকী ও তারেক জামিল। হামদ-নাত পরিবেশন করবেন জাগ্রত কবি মুহিব খান, আনিছ আনসারী, হাফেজ এমদাদুল ইসলাম, মামুন আনসারী, কাজী আমিনুল ইসলাম, আবু সুফিয়ান, এনামুল কবির, সফিউল্লাহ বেলালী, ইসহাক আলমগীর, হাসনাত রায়হান ও ইশতিয়াক আহমাদ।