আমাদের মুক্তিযুদ্ধ

সব ক'টি জানালা খুলে দাও না....

প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ |

আবদুল মালেক, উপ-সম্পাদক ■ বাংলাদেশ প্রেস

চৌদ্দ ডিসেম্বর, আজ শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি, যাঁরা দীর্ঘ তেইশ বছরের বাঙালীর আন্দোলন-সংগ্রামে বিবেকের ভূমিকা পালন করেছিলেন। শহীদ পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা, জানি কোন সমবেদনাই স্বজন হারানোর বেদনাকে প্রশমিত করতে পারে না। যাদের হারায় তারাই জানে হারানোর বেদনা। পাকিস্তানি অপশাসন-দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সদা জাগ্রত ছিলেন বুদ্ধিজীবীরা। তোমাদের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি, অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। যেখানেই থাকো, অনেক ভালো থেকো হে শ্রষ্ঠ সন্তানেরা।

পাকিস্তান সৃষ্টির প্রারম্ভিক পর্যায়েই বুঝা গিয়েছিল এ স্বাধীনতা, বাঙালীর স্বাধীনতা নয়। ধীরে ধীরে পাকিস্তানী অপশাসনের বিরুদ্ধে সংগঠিত হতে থাকে রাজনৈতিক নেতৃবর্গ এবং সেই সাথে বিবেকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় এ দেশের শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী মহল। প্রথমেই পশ্চিমারা দু'টো জিনিসে আঘাত হানে, প্রথমত ভাষার উপর আঘাত এবং দ্বিতীয়ত আমাদের জাতিসত্ত্বার পরিচয় ভুলিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু বুদ্ধিজীবী মহল এটি মেনে নেয়নি।

আমরা হাজার বছরের বাঙালী, জাতিসত্তার এই পরিচয় আমাদের অহংকার। পাকিরা এটা বুঝতে পেরেই আমাদের পরিচয় বদলে ধর্মের আবরন দিতে ব্যর্থ চেষ্টা করে। আমাদের বাঙালী সাহিত্য-সংস্কৃতির উপরও আঘাত হানে। এক সময় রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর সাহিত্য-গান-কবিতা-নাটক নিষিদ্ধ করা হয়। আমাদের বুদ্ধিজীবীরা তা মুখবুঝে সহ্য করেনি। এর বিরুদ্ধে তারা প্রতিবাদ করেন যে যাঁর অবস্থান থেকে। তাদের কলম সচল ছিল, তাঁরা লিখে, গান করে, নাটক মঞ্চস্থ করে, সভা-সমিতি, বক্তৃতায় প্রতিবাদের ঝড় তোলেন। আপামর জনগনের মাঝে তাঁরাই সচেতনতার বীজ রোপন করেন।

পাকিস্তানি শাসকেরা বুদ্ধিজীবিদের বাগে নিতে নানা কৌশলের আশ্রয় নেয়। ভয়-ভীতি প্রদর্শন, লোভনীয় জীবনের প্রলোভন, কিন্তু কোনো ফল হয়নি। বাংলা মায়ের সোধা মাটি যাদের গায়ে, যাদের নেতা সর্বকালের সেরা বাঙালী বঙ্গবন্ধুর মতো লৌহমানব তাঁরা কি প্রলোভনে ভুলে। বাঙালীর মন ও মনন নির্মানে রাজনৈতিক নেতাদের মতোই নিজেদেরও উৎসর্গ করেছিলেন আমাদের এই শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীরা। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও অনবদ্য ভূমিকা রাখেন তারা। পাকি বাহিনীর নিষ্ঠুরতা-বর্বরতার চিত্র বিশ্বদরবারে তুলে ধরেন তাদের খুরধার লেখনীর মাধ্যমে। 

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এক সাগর রক্ত পেরিয়ে স্বাধীনতার মাত্র ৪৮ ঘন্টা আগে এই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের আমরা হারালাম। পাকিস্তানিরা যখন নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে তখন সবচাইতে জঘন্য কাজটি করে জেনারেল রাও ফরমান আলী। যুদ্ধের পর তার ডায়েরী থেকে বুদ্ধিজীবীদের নামের তালিকা পাওয়া যায়। বিজয়ের প্রাক্কালে প্রায় দু'শতাধিক বুদ্ধিজীবীদের তুলে নিয়ে যায়। আর এ কাজে তাকে সহযোগিতা করে আলবদর নেতা ও কুখ্যাত রাজাকার আলী আহসান মো. মুজাহিদ, যার নাম নিতেও ঘৃনা হয়। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন বদ্যভূমিতে তাদের বিকৃত লাশ পাওয়া যায়। তোমাদের রক্তের ঋন শোধ হবার নয়, তবে যতদিন রবে এই মাটি, এই দেশ ততদিন তোমরা রবে আমাদের অন্তরের মনিকোঠায় চির অমলিন।

তবে কলঙ্কের সে কালিমা ধীরে ধীরে মুক্ত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর রক্তের যোগ্য উত্তরাধিকার গণতন্ত্রের মানসকন্যা শেখ হাসিনার দৃঢ়তায়। সেই সব রাজাকার, আলবদর যারা আস্ফালন করেছিল, দাপিয়ে বেরিয়েছিল ক্ষমতার মসনদ সেই জানোয়ারদের বিচারের আওতায় এনেছেন তিনি। পশুদের বিচার হয়েছে, রায় হয়েছে এবং কার্যকরও হয়েছে। যাঁরা গেছেন তাদের আমরা ফিরে পাবো না বটে তবে বিচারের মাধ্যমে তাদের আত্মা শান্তি পাবে, তাদের পরিবারের দীর্ঘদিনের পাষান চাপা দীর্ঘশ্বাস কিছুটা হলেও লাঘব হবে। হে শ্রেষ্ঠ সন্তানগণ, তোমরা ভালো থেকো, আমরা আছি চির অতন্দ্র প্রহরী, বেপথু হবেনা বাংলাদেশ। তোমাদের স্মৃতির প্রতি আবারো গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।