শিল্প ও সাহিত্য

ফিরে দেখা ১৫ আগস্টঃ রাসেলকে লেখা চিঠি

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০১৯

লুৎফর রহমান রিটন

বন্ধু রাসেল, 

তুমি জন্মেছিলে ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবরে, ধানমণ্ডির বিখ্যাত ৩২ নম্বর সড়কের ঐতিহাসিক বাড়িটিতে। তোমাদের বত্রিশ নম্বর সড়কের বাড়িটি এখন বাঙালির শোকাচ্ছন্ন তীর্থকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। একদা এই দেশটার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তোমার বাবা। আর এখন প্রধানমন্ত্রী তোমার হাসু আপা। তুমি বড় ভাগ্যবান রাসেল, তুমি বড় দুর্ভাগা।

তোমার হাসু আপা, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, তাঁকে বহুবার কাঁদতে দেখেছি রাসেল। বহুবার। তোমার কথা বলতে গেলেই কেঁদে ফেলেন তিনি। বড় কষ্ট হয় তখন আমাদের। যে কোনো শিশুসমাবেশে গেলেই, উচ্ছ্বল শিশুদের দেখলেই রাসেল রাসেল বলে কেঁদে ওঠেন তোমার হাসু আপা। ১৯৯৬ সালের ২৯ আগস্ট আমার সম্পাদিত 'ছোটদের কাগজ' পত্রিকাটির প্রথম বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানেও প্রধান অতিথির বক্তৃতা দেবার সময় হাসিখুশি তোমার হাসু আপা সহসা তোমার কথা বলতে গিয়ে অশ্রুসজল হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর আকুল করা হৃদয় ভাঙা কান্না আমাদের বেদনার্ত করত রাসেল। কতোটা অসহায় ছিলাম আমরা--একটা দেশের প্রধানমন্ত্রী কেঁদে কেঁদে তাঁর ছোট্ট ভাইয়ের হত্যার বিচার চাইছেন!

--এভাবেই শুরু হয়েছে বইটা।

''এরপর পরিবারের কনিষ্ঠপুত্র হিশেবে মা-বাবা-ভাইয়া আর বোনেদের আদরের প্লাবনে ভাসতে ভাসতে বড় হতে থাকা রাসেল নামের ছোট্ট ছেলেটার জীবনের বর্ণালি শৈশবের নানা হাসি-আনন্দের অলিগলি পেরিয়ে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের সেই ভয়াল ভয়ংকর রাত। ঘাতকদের বুলেটে নির্মমভাবে নিহত জাতির পিতার পুরো পরিবারের সঙ্গে ছোট্ট শিশু রাসেলেরও রক্তাক্ত করুণ পরিণতি। জার্মানিতে অবস্থানের কারণে রাসেলের বড় দুই বোন শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানার বেঁচে যাওয়া। দীর্ঘদিন প্রবাস জীবন কাটিয়ে অতঃপর শেখ হাসিনার বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন। তাঁর প্রধানমন্ত্রী হওয়া। এবং রাসেল হত্যার বিচার--এ সবকিছুই ধারাবাহিক ভাবে উঠে এসেছে বইটিতে, ইতিহাসের অংশ হয়ে। সেই হিশেবে বইটা গতানুগতিক জীবনীগ্রন্থ নয়। এটি একটি প্রামান্যগ্রন্থ--একটি পরিবারের এবং একটি দুর্ভাগা দেশ ও দেশের ততোধিক দুর্ভাগা জনগোষ্ঠীর।

বইয়ের শেষ অংশটা উদ্ধৃত করছি---''অনুজপ্রতীম বন্ধু রাসেল,

আজ তোমাকে দ্বিতীয় চিঠিটি লিখতে গিয়ে বারবার আমার কেবল মনে পড়ছে তোমার সাইকেলটির কথা। তিন চাকার বেবী সাইকেল। কিড়িং কিড়িং বেল বাজিয়ে ঘর বারান্দা উঠোন লবি চষে বেড়াতে তুমি। কোক পটেটো চিপস আর বর্ণালি টিকটিকির ডিম (স্মার্টি) ভীষণ পছন্দ ছিল তোমার। জানো রাসেল, আমার কন্যা নদীরও ছেলেবেলায় ভীষণ প্রিয় ছিল এই টিকটিকির ডিম। নদীর জন্যে নানান বর্ণের খুদে খুদে টিকটিকির ডিমের প্যাকেট কিনতে গিয়ে কতোদিন যে তোমার কথা মনে পড়েছে আমার!

শুনেছি খুনীরা একে একে তোমাদের পরিবারের সবাইকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করার পর সবার শেষে হত্যা করেছে তোমাকে। তুমি কাঁদছিলে। 'মায়ের কাছে যাবো, মায়ের কাছে যাবো' বলে কাঁদছিলে তুমি। কাঁদবেই তো। তুমি তো বন্ধু মায়ের কাছেই যেতে চাইবে। মায়ের বুকের উষ্ণতা আর মায়ের গায়ের গন্ধই তো তোমার সবচে প্রিয় হবার কথা। খুনীরা সবাইকে শেষ করার পর তোমাকে পেয়েছিল। তোমাকে মায়ের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। তোমার বাবার লাশ, মায়ের লাশ, ভাইদের লাশ অতিক্রম করে তুমি পৌঁছে গিয়েছিলে মায়ের লাশের কাছে। মায়ের লাশের পাশে তোমাকে দাঁড় করিয়ে তোমার মাথায় রিভলবার ঠেকিয়ে গুলি করেছিল মানুষরূপী একটা পশু। রক্তাক্ত তুমি কি লুটিয়ে পড়েছিলে মায়ের লাশের ওপর? শেষ মুহূর্তে কি তুমি মায়ের বুকের উষ্ণতাটুকু পেয়েছিলে বন্ধু? শেষ মুহূর্তে তোমার মায়ের গায়ের গন্ধ কি পেয়েছিলে তুমি?


ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বরের বাড়িতে ঢুকলেই আমি ছোট্ট তিনচাকার সাইকেলের কিড়িং কিড়িং বেল-এর শব্দে সচকিত হয়ে উঠি। আমি টের পাই, এইমাত্র আমাকে পাশ কাটিয়ে সাঁই সাঁই করে চলে গেল ছোট্ট একটা সাইকেল। আর সাইকেলের চালকের আসনে ছোট্ট এইটুকুন একটা ছেলে। ছেলেটার পরনে একটা রক্তে ভেজা জামা। ছেলেটা কাঁদছে—'আমি মায়ের কাছে যাবো। মায়ের কাছে যাবো...।আহারে!

[সূত্র > শেখ রাসেলকে লেখা চিঠি/লুৎফর রহমান রিটন। প্রচ্ছদ হাশেম খান। প্রকাশক বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, ২০১৫। ] 

অটোয়া ১৪ আগস্ট ২০১৯