আন্তর্জাতিক

শুনানিকালে পাথরের মতো বসেছিলেন সু চি

প্রকাশ: ১০ ডিসেম্বর ২০১৯

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ■ বাংলাদেশ প্রেস

এতদিন ধরে অভিযোগ কেবল শুনে এলেও প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা গণহত্যা ইস্যুতে বিচারের মুখোমুখি হতে হচ্ছে মিয়ানমারকে।মঙ্গলবার নেদারল্যান্ডের দ্য হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে গাম্বিয়ার মামলাটির শুনানি শুরু হয়েছে। প্রথম দিনের শুনানিতে গাম্বিয়া যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছে।নিজ দেশের হয়ে এই মামলায় লড়ছেন মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি। শুনানিকালে তিনি পাথরের মতো বসেছিলেন। এড়িয়ে গেছেন গণমাধ্যমকেও।

শুনানিতে মিয়ানমার যেন তার জনগৌষ্ঠী রোহিঙ্গাদের ওপর এখনই গণহত্যা বন্ধ করে সে ব্যাপারে আন্তর্জাতিক আদালতের (আইসিজে) নির্দেশনা চেয়েছে আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া। যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় এই নির্দেশনা চান গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী আবুবকর মারি তামবাদু।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা চালিয়ে মিয়ানমার বৈশি^ক সনদ লঙ্ঘন করেছে কি না, তার বিচারই আইসিজের এই শুনানির উদ্দেশে। নেদারল্যান্ডের দ্য হেগের পিস প্যালেসে স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, রোহিঙ্গা এবং মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে শুনানি শুরু হয়। শুনানির শুরুর আগে মিয়ানমারের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে আদালতে উপস্থিত হন দেশটির বিতর্কিত নেত্রী অং সান সু চি। আদালতে প্রবেশের আগে সাংবাদিকরা মামলার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলেও তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তর দেননি।

বিবিসি সংবাদদাতারা জানায়, মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলের নেতা হিসেবে সু চি যুক্তি দেখাবেন যে এই বিষয়ে বিচার করার অধিকার আইসিজের নেই।

আইসিজেতে শুনানির প্রথম দিন গাম্বিয়া নিজেদের যুক্তি উপস্থাপন করেছে। বুধবার মিয়ানমার নিজেদের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করবে। তারপর বৃহস্পতিবার উভয় দেশ পাল্টা যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করবে। এরপর আলোচিত মামলাটিতে আইসিজে তাদের নির্দেশনা দেবে। যদিও আইসিজের বিধি অনুযায়ী এই মামলার রায় আসতে অন্তত ৮ সপ্তাহ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ কয়েক বছরেও গড়াতে পারে। আদালতের সিদ্ধান্ত হবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে।

শুনানির প্রথম দিকে গাম্বিয়ার লক্ষ্য হচ্ছে, আদালতের কাছ থেকে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ লাভ করা। উদ্দেশ্য, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে যে প্রায় ছয় লাখ রোহিঙ্গা রয়ে গেছেন তাদের ওপর যে কোন ধরনের নির্যাতন না চলে, তা সুনিশ্চিত করা। পাশাপাশি, সাক্ষ্য-প্রমাণ ধ্বংস করার বিরুদ্ধেও ওই আদেশ কার্যকরী হবে বলে বাদী পক্ষ আশা করছে।

প্রথমদিনের শুনানির শুরুতে আইসিজের প্রেসিডেন্ট আবদুলকোয়াই আহমেদ ইউসুফ শুনানির প্রক্রিয়া সম্পর্কে আদালতকক্ষে উপস্থিত সবাইকে অবহিত করেন। এর আগে গাম্বিয়ার প্রস্তাবিত নাভি পিল্লাই এবং মিয়ানমারের ক্লাউস ক্রেসকে এডহক বিচারপতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

পরে তাদের শপথের মধ্য দিয়ে শুনানির প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরপর আইসিজের রেজিস্ট্রার ফিলিপ গোটিয়ার অন্তর্বর্তী পদক্ষেপের নির্দেশনা চেয়ে গাম্বিয়া আবেদনে যা বলেছে, তা পড়ে শোনান।

তারপর কেন মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলাটি করেছে গাম্বিয়া তার প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন গাম্বিয়ার আইন ও বিচারমন্ত্রী আবুবকর মারি তামবাদু। তিনি বলেন, আমরা এত দূরে থেকেও কেন আইসিজেতে এসেছি? কারণ, বিশে^ যেকোনো স্থানে এমন গণহত্যা হলে দূরে থাকলেও এর বিচারের দায় আমরা এড়াতে পারি না।

গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী আবুবকর মারি তামবাদু বলেন, ‘মিয়ানমার এখনও গণহত্যাপ্রবণ এবং এই বর্বরতা চালিয়ে যেতে চায়। রোহিঙ্গা গণহত্যার ঘটনা হঠাৎ করে সংঘটিত হয়নি। বরং একটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ফসল। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীদের দীর্ঘদিন ধরেই বাঙালি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। জেনোসাইড কনভেনশনের আওতায় রাখাইনে সুনির্দিষ্ট অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এ ছাড়া জাতিসংঘের অনুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে মিয়ানমার রাষ্ট্রীয়ভাবে গণহত্যা চালিয়েছে।’

গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী আবুবাকার তাম্বাদু আরও বলেন, ‘সারা বিশ^ কেন এখন নীরব দর্শক? কেন আমাদের জীবদ্দশাতে এটা আমরা ঘটতে দিচ্ছি? তিনি বলেন, ‘সবাই মনে করে এখানে মিয়ানমারের বিচার হচ্ছে। আসলে এখানে বিচার চলছে আমাদের সামগ্রিক মানবিকতার।’

যুক্তরাষ্ট্রের আইনজীবী তাফাদজ পাসিপান্দো বলেছেন, রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণের কথা অস্বীকার করতে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি বলেছেন, সেনাবাহিনী এবং বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর কেউ নোংরা বাঙালি মেয়েকে ছোঁবে না। ওরা আকর্ষণীয় নয়। তিনি আরো বলেন, ফেসবুকে ‘ফেক রেপ’ নামে যে পেজ খোলা হয়েছে, সেটির নিয়ন্ত্রণও হচ্ছে স্টেট কাউন্সিলের দপ্তর থেকে।’

আইনজীবী পাসিপান্দো আরো বলেন, রোহিঙ্গাদের চাষাবাদের জমি কেড়ে নেওয়া হয়েছে, খাদ্য সরবরাহ কমানো হয়েছে, তাঁদের পালিত পশু কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে জাতিসংঘ তদন্তে যে তথ্য উঠে এসেছে, তার উদ্দেশ্য হচ্ছে তাদের অভুক্ত রাখা। এগুলো গণহত্যার উদ্দেশ্য হিসেবে সনদের লঙ্ঘন। আরও গণহত্যার অপরাধ যাতে না ঘটে, সে জন্য ব্যবস্থা নিতে পারেন এই আদালত। তিনি বিভিন্ন প্রমাণ তুলে ধরে বলেন, এগুলোয় গণহত্যার উদ্দেশ্যের প্রতিফলন ঘটেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আরেক আইনজীবী অ্যান্ড্রু লোয়েনস্টেইন বলেন, মিয়ানমার জনমিতিক গঠন (ডেমোক্রাফিক) পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। দেশটির সেনাপ্রধান রোহিঙ্গাবিরোধী প্রচারে জড়িত থাকায় তার ফেসবুক ও টুইটার অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিতে হয়েছিল, যা রাষ্ট্রীয় নীতি ও ভূমিকার প্রমাণ।