শিরোনাম:

Sun 26 November 2017 - 12:05pm

ফিরে দেখা পিলখানার নৃশংসতা

Published by: নিউজ রুম এডিটর, বাংলাদেশ প্রেস

088597bd5e4ed1179db84081bb503388.jpg

ড. মিল্টন বিশ্বাস: ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় নির্মম হত্যাকান্ড সংঘটিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই নৃশংস ঘটনার বিচার হবে বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। গত বছর (২০১৩) বিচারের রায় হয়েছে এবং ১৫১ জনের ফাঁসি ও অন্যান্য দন্ডের রায় আমরা পেয়েছি। সেদিনকার সেই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের কথা স্মরণ করলে আজো আমরা শিউরে উঠি। সেদিন পিলখানার বিডিআর সদর দপ্তরের নিরাপদ চত্বরে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল সেনাবাহিনীর ৫৭ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং আরো অনেক নিরীহ ব্যক্তিকে। সব মিলে ৭৪ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন সেদিন। কেবল নির্মম হত্যা নয়, সেই কালো দিনে মৃতদেহগুলো নর্দমায় নিক্ষেপ করা হয়েছিল; লাশ গুম করে মাটি চাপা দেয়া হয়েছিল। পিলখানার সেই নিষ্ঠুরতা যে বেদনা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল তা আজো দীর্ঘ নিঃশ্বাসে বাতাস ভারি করে চলেছে। বৃদ্ধ মা-বাবা তার সন্তান হারিয়েছেন, স্ত্রী প্রিয়তম স্বামীকে, সন্তান তাদের প্রাণের বাবাকে সেদিনের পরে আর খুঁজে পায়নি। স্বজন হারানো মানুষের কান্নার রোল আজো থামেনি। 

শেখ হাসিনার সরকার এই হত্যাযজ্ঞ পরিস্থিতি সেদিন দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছিলেন। অপরাধীদের বিচার দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে সম্মানিত করার প্রতিজ্ঞাও রেখেছেন তিনি। ২০০৯ সালে মহাজোট সরকারের নেতৃত্বে গণতন্ত্র নতুন করে বিকশিত হওয়ার সময় চক্রান্তকারীদের পিলখানা হত্যাযজ্ঞ দেশের ইতিহাসে মর্মন্তুদ ঘটনা। ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র দেড় মাসের মাথায় এই বর্বরোচিত ঘটনা কিসের আলামত ছিল? 

সেনাবাহিনীর ৫৭ কর্মকর্তা হত্যার শিকার হবার পরেও গোটা ফোর্স ধৈর্য ধারণ করেছে; ন্যায় বিচারের অপেক্ষা করেছে। এ কেবল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আস্থা থেকে সম্ভব হয়েছে। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৯-এ বিডিআরের উদ্দেশে তাঁকে বলতে শোনা যায়- 'আপনারা জানেন, গতকাল (২৫ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে তার জন্য আমি অত্যন্ত মর্মাহত। আত্মঘাতী এই হানাহানিতে জীবন দিতে হয় আমাদের দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তা, বিডিআর সদস্য ও বেসামরিক নাগরিকদের। এ প্রাণহানির ঘটনায় আমি দারুণভাবে মর্মাহত এবং দুঃখিত। আমি নিহতদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। তাদের পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা জানাই। 

আমার প্রশ্ন, কার বুকে গুলি চালাবেন? তারা তো আপনারই ভাই। ভাই হয়ে ভাইয়ের বুকে গুলি করবেন না। আপনার বোনকে বিধবা করবেন না। আমরা আপনাদের সমস্যা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। অত্যন্ত ধৈর্যসহকারে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা আমরা করে যাচ্ছি। আপনারা আমাকে সাহায্য করুন। এমন পথ বেছে নেবেন না যে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। আমাকে দেশের স্বার্থে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করবেন না। মনে রাখবেন, সংঘাত আরো সংঘাত বাড়ায়। আপনারা সংযত হোন। অস্ত্র সমর্পণ করুন। আপনাদের কোনো ক্ষতি হবে না, আমি আশ্বস্ত করছি।'

প্রধানমন্ত্রীর সেদিনের পুরো ভাষণ জুড়ে ছড়িয়ে আছে নিহতদের জন্য শোক আর তাদের স্বজনদের জন্য কাতরতা। ভাষণটির শেষাংশে তিনি বিডিআর বিদ্রোহীদের কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি করেছেন যেমন, তেমনি বারবার সেনা পরিবারের ক্ষতির কথা স্মরণ করেছেন। এর চেয়ে মানবিক দলিল আর কি হতে পারে? ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে পিলখানার তান্ডবের খবর পেয়ে তিনি সংকট সমাধানে নিজেই উদ্যোগ গ্রহণ করেন। মন্ত্রিসভার সদস্য, নিজের দল ও মহাজোটের নেতৃবৃন্দ, তিন বাহিনী প্রধান, পুলিশের আইজি, র্যাবের ডিজিসহ আরো অনেকের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেন। সকলের পরামর্শের ভিত্তিতেই প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক ও হুইপ মির্জা আজমকে পিলখানায় প্রেরণ করা হয়। তাঁরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নেত্রীর নির্দেশে সংকট নিরসনে প্রচেষ্টা চালান। তত্কালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুনসহ আওয়ামী লীগ ও মহাজোটের বেশ কয়েকজন নেতা বর্বর বিডিআর জওয়ানদের ভয়ে ভীত না হয়ে পিলখানায় ঢুকে জিম্মিদশা থেকে উদ্ধার করেন সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারকে। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর প্রজ্ঞা, বুদ্ধিমত্তা, কৌশল ও দূরদর্শী নেতৃত্ব, তিন বাহিনীর প্রধানদের আন্তরিক সহযোগিতায় অবসান ঘটে তথাকথিত বিডিআর বিদ্রোহের।

বড় ধরনের রক্তপাত থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করলেও শেখ হাসিনার দায়িত্ব তখনো শেষ হয়নি। কঠিন শোকের মধ্যেও সমগ্র সেনাবাহিনীর সদস্যরা শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে প্রতিশোধ স্পৃহায় মেতে ওঠেননি নেত্রীর প্রতি আস্থার কারণে। আর তাদের দেশপ্রেম ও সংযমের কথা দেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে বলেই তিনি মার্চের(২০০৯) প্রথম দিন সেনাকুঞ্জে সেনা-কর্মকর্তাদের মুখোমুখি হয়ে তাদের ক্ষোভের প্রশমন করেন। সেনাকুঞ্জের এই সাক্ষাতের ঘটনা নিয়ে বিরুদ্ধ পক্ষ ইন্টারনেটে নানা অপপ্রচার চালায় এবং এখনো তা অব্যাহত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগত জীবনের শোকের কথা বলে সেদিন উপস্থিত সেনাদের প্রাথমিক বিভ্রান্তির অবসান করেছিলেন। সেদিন নির্বাচিত ও গণতান্ত্রিক সরকারের নির্দেশকে অসীম মর্যাদা দিয়েছিলেন সেনা কর্মকর্তারা। সেনাকুঞ্জে তাদের আহাজারি ও ক্রন্দনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী সেদিন শোকের প্রকাশ দেখেছিলেন।

পিলখানা হত্যাযজ্ঞের শিকার সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে ১০ লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছে। সেনাপ্রধানের তহবিল থেকে পাঁচ লাখ ও পারিবারিক নিরাপত্তা প্রকল্প থেকে আট লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। পারিবারিক পেনশন দেয়া হয়েছে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা। প্রতি পরিবারের জন্য দেয়া হয়েছে প্লট। যোগ্যতা অনুসারে পরিবারের সদস্যদের চাকরির পাশাপাশি ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে ১০ বছরের জন্য মাসিক ৪০ হাজার টাকা অনুদান দেয়া হয়েছে। 

আপনজন হারানোর ক্ষতির কাছে এই অর্থ কিছুই নয়। জীবনের বিনিময় মূল্যও এটি নয়। যে সব মেধাবী সেনা অফিসারদের আমরা হারিয়েছি তার ক্ষত শুকাবে না কখনো। তাদের শূন্যস্থান পূরণ হবারও নয়। কেবল বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে আমরা সান্ত্বনা পেতে পারি; ক্ষত শুকাতে পারে কিছুটা।

ইতোমধ্যে বিশেষ আদালত রায় ঘোষণা করে অনেককে শাস্তি প্রদান করেছেন। তবে বিডিআর বিদ্রোহের বিচারের হালনাগাদ তথ্য না পেয়ে সশস্ত্র বাহিনীর অনেক সদস্য কয়েক বছর আগে ভুল ধারণা পোষণ করছিলেন। স্পর্শকাতর বিষয়টিকে কাজে লাগিয়ে নেতিবাচক প্রচারণার মাধ্যমে হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার প্রয়াস গত কয়েক বছর থেকে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই নারকীয় ঘটনায় সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত আসামিদের পক্ষে কথা বলছেন অনেকেই; তার সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থকরাও জড়িত। মূলত একটি জটিল মামলা হওয়ায় এর চার্জ গঠনের প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় লেগেছে। অপরাধের যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চার্জ গঠনে দীর্ঘ সময় প্রদান যুক্তিযুক্ত ছিল। 

এজন্য নতুন আইন তৈরি করা হয়েছে। অথচ বিভিন্ন ওয়েবসাইটে এবং বিচিত্র ব্লগে পিলখানা হত্যাকান্ড নিয়ে ব্যাপক অপপ্রচার চালানো হয়েছে। বিডিআর পুনর্গঠনের কাজ শেষ হয়েছে। নাম পরিবর্তন করে 'বিজিবি' রাখা হয়েছে। ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদে 'বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ' আইন পাস করা হয়েছে। বাহিনীর নতুন নামের সঙ্গে সঙ্গে এর মনোগ্রাম, পোশাক, ব্যাজ পরিবর্তন করা হয়েছে।

শেখ হাসিনা সরকার গঠনের মাত্র দেড় মাসের মাথায় দেশের এক জটিল ও ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলা করে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। পিলখানা হত্যাযজ্ঞের সেই দিনগুলোতে তাঁর দৃঢ় মনোভাব ও প্রজ্ঞাপ্রসূত দিক-নির্দেশনা এবং পরবর্তী সময়ে সেই নৃশংস ঘটনার রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে অপপ্রচারের সমুচিত জবাব দেয়া সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের দৃঢ়তা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুনঃ 

Last update: Sun 26 November 2017 - 10:29pm

Facebook

মন্ত্যব্য করুন