স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা

কোভিড-১৯ রোগে কনভ্যালসেন্ট প্লাজমা বিজ্ঞান, বাস্তবতা ও বিতর্ক

প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২০ |

নিজস্ব প্রতিনিধি ■ বাংলাদেশ প্রেস

কোনো সংক্রামক রোগ থেকে সেরে ওঠা প্রাণীর রক্তে ওই সংক্রমণের বিরুদ্ধে কার্যকর উপাদান (antibody) তৈরি হতে পারে যা পরবর্তী সময়ে অন্য কোনো প্রাণীর শরীরে ওই সংক্রমণের বিরুদ্ধে কার্যকর হতে পারে’ এ মূলনীতি যে কোনো সংক্রামক রোগের চিকিৎসায় convalescent plasma ব্যবহারের ভিত্তি; COVID-19-এর ক্ষেত্রেও তাই।



এটি COVID চিকিৎসার ক্ষেত্রে নতুন কোনো আবিষ্কার তো নয়ই বরং প্রাচীনতম। ১৪০ বছর আগে, ১৮৮০ সালে জার্মানির এমিল ভন বেরিং এবং জাপানি চিকিৎসক শিবাশাবুরা কিতাসাতো দেখান যে কোনো প্রাণীর শরীরে ডিপথেরিয়ার জীবাণু প্রবেশ করানোর কিছুদিন পরে তার রক্তরস বা serum সংগ্রহ করে ডিপথেরিয়া আক্রান্ত অন্য প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করালে তা আক্রান্ত প্রাণীটিকে সারিয়ে তুলতে সক্ষম। শিগগিরই তারা এটি মানুষের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করে সাফল্য পান। তারা এ সিদ্ধান্তে আসেন, জীবাণুর সংস্পর্শে আসার কারণে রক্তে এক ধরনের উপাদান তৈরি হয় যা ওই জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকর।


তারা এ সম্ভাব্য উপাদানের নাম দেন antitoxin, যাকে পরবর্তী সময়ে antibody বলা হয়। এ আবিষ্কার ছিল Immunology বা রোগ প্রতিরোধ বিদ্যার এবং ভ্যাকসিনের ধারণার ভিত্তি, যার জন্য ১৯০১ সালে চিকিৎসাবিদ্যার প্রথম নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। এরপর antibody শনাক্ত করাসহ আধুনিক immunology বর্তমানে এমন উচ্চতায় পৌঁছেছে যে, সেদিনের সেই আবিষ্কার যদি হয় বেসক্যাম্প তবে আজকের অবস্থান পর্বতচূড়া। Convalescent Plasma তে এই antibody-এর উপস্থিতি আর কার্যকারিতার ভরসাতেই এটি প্রয়োগ করা হয়।


এমিল ভন বেরিং-দের আবিষ্কারের পর থেকে ১৯৪০ সালে অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের আগে পর্যন্ত convalescent plasma অথবা convalescent serum ছিল সংক্রামক রোগের চিকিৎসায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। Convalescent Plasma-এর ব্যবহারের বিপুলসংখ্যক রিপোর্ট পাওয়া যায় ১৯১৮-২০ সালের কুখ্যাত স্প্যানিশ ফ্লুয়ের সময় থেকে। অ্যান্টিবায়োটিকের আবিষ্কারের কারণে ১৯৪০ সালের পরে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের ক্ষেত্রে এর ব্যবহার প্রায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেলেও ভাইরাস সংক্রমণ, বিশেষত নতুন অজানা ভাইরাসের সংক্রমণের ক্ষেত্রে এর ব্যবহার একেবারে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়নি।


পরবর্তী সময়ে ইবোলা, মারবার্গ, আর্জেন্টাইন হেমোরেজিক ফিভার, সার্স-১, মার্স ইত্যাদি বিভিন্ন মহামারীতে convalescent plasma বা কখনও কখনও পুরো রক্তই ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়। ওইসব তথ্যের মধ্যে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ফলাফল যেমন আছে তেমন আছে অকার্যকারিতার খবরও। এটি আসলে কতটা নিরাপদ ও কার্যকর তা সুনিশ্চিত করে বলার মতো নিবিড় গবেষণা (controlled trial) তেমন হয়নি বা হওয়ার মতো সুযোগ ও সময় সম্ভবত হয়নি। COVID-19 রোগেও এ পর্যন্ত এর ব্যবহারে বেশকিছু আশাব্যঞ্জক ফলাফল পাওয়া গেলেও চূড়ান্ত মীমাংসায় পৌঁছনোর জন্য সেগুলো যথেষ্ট নয় ওই একই কারণে; অর্থাৎ, ফলাফলগুলো কোনো উচ্চমানসম্পন্ন গবেষণা থেকে আসেনি। Convalescent plasma অথবা serum অথবা পুরো রক্ত ব্যবহারের ফলাফলে কেন এ অনিশ্চয়তা?


কারণ, এতক্ষণের আলোচনায় রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা immune system তথা অ্যান্টিবডি বিষয়গুলো যত সরল বলে মনে হল তত সরল তো নয়ই, বরং চূড়ান্ত রকমের জটিল। সে আলোকে convalescent plasma-এর কার্যকারিতার অনিশ্চয়তার বিষয়ে সহজ করে কিছু আলোকপাত করা যাক।


প্রথমত : অ্যান্টিবডি থাকলেই তা কার্যকরভাবে সংক্রমণ প্রতিরোধ বা দমন করতে পারবে তার আদৌ কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই যদি থাকত তবে সব ক্ষেত্রে ভ্যাকসিন তৈরি জলের মতো সোজা হয়ে যেত। কোনো জীবাণুর শরীরের ভিন্ন ভিন্ন উপাদানের বিরুদ্ধে অনেক অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। এর অধিকাংশই non-neutralizing অ্যান্টিবডি আর কিছু কিছু neutralizing অ্যান্টিবডি। শুধু neu


traliæing অ্যান্টিবডি যদি থাকে এবং যথেষ্ট মাত্রায় থাকে তবেই তা সংক্রমণ দমন বা প্রতিরোধে কার্যকর হতে পারে, নচেৎ নয়। যেমন হেপাটাইটিস-সি, এইডস ইত্যাদির জীবাণুর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি কোনো কাজেই আসে না। আর non-neutralizing অ্যান্টিবডি কোনো উপকারে তো আসেই না বরং তা গুরুতর ক্ষতির কারণ হতে পারে, সে আলোচনা একটু পরে।


দ্বিতীয়ত : সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সবসময় অ্যান্টিবডিনির্ভর নয়। যেমনম- যক্ষ্মার ক্ষেত্রে রক্তের T-cell এ কাজটি করে। এইডসের ক্ষেত্রেও তাই, যদিও এইডস এ T-cell কেই আক্রমণ করে ধ্বংস করে।


চিকিৎসা বিজ্ঞানের যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের সবচেয়ে বড় নিয়ামক risk benefit ratio বা ঝুঁকির বিপরীতে উপকারের মাত্রা। অতএব, কার্যকারিতার সঙ্গেই চলে আসে ঝুঁকির প্রশ্ন। Convalescent plasma দিয়ে চিকিৎসা একেবারে ঝুঁকিমুক্ত কি না এ প্রশ্নের এক কথায় উত্তর, না।


ঝুঁকি-১ : Plasma যেহেতু রক্ত উপাদান সেহেতু এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সার্বজনীন ঝুঁকি হচ্ছে রক্তবাহিত জীবাণু যেমন হেপাটাইটিস, এইচআইভি ইত্যাদি সংক্রমণ। ইউরোপ আমেরিকার মানের ব্যয়বহুল ডোনার ব্লাড স্ক্রিনিং, যেখানে নিউক্লিয়িক এসিড (DNA বা RNA) টেস্টের মাধ্যমেও ভাইরাসের অনুপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়, সেখানেও এ সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি আনা সম্ভব হলেও সেটা একেবারে শূন্য করা সম্ভব নয়।


ঝুঁকি ২ : সম্ভাব্য প্রাণঘাতী Transfusion Related Acute Lung Injury (TRALI) এর আশংকা প্রায় সম্পূর্ণ দূর করা সম্ভব যদি রক্তদাতা কখনও গর্ভধারণ করেছেন এমন কোনো নারী না হন বা কখনও নিজেই রক্ত নিয়েছেন এমন কোনো ব্যক্তি না হন।