শিক্ষাঙ্গন

একই ব্যক্তির নমুনায় ভিন্ন ফলাফল, বাড়ছে সংশয়

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২০ |

নিজস্ব প্রতিনিধি ■ বাংলাদেশ প্রেস

২৪ মে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট শুরু হয় চট্টগ্রাম নগরীর লালখান বাজার এলাকার বাসিন্দা সোহাগ মিয়ার। অসুস্থতা বাড়তে থাকলে ফৌজদারহাটের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেসে (বিআইটিআইডি) কভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য নমুনা দেন তিনি। একই দিনে নমুনা দেয়া হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালেও। যদিও রিপোর্ট পাওয়ার আগেই ২৫ মে চমেক হাসপাতালে মারা যান তিনি।

সোহাগ মিয়ার মৃত্যুর পর নমুনা দেয়া দুই হাসপাতাল থেকে ভিন্ন রিপোর্ট হাতে পায় স্বজনরা। এতে বিআইটিআইডি থেকে পাওয়া নমুনা পরীক্ষার ফলাফলে কভিড-১৯ নেগেটিভ এলেও চমেক হাসপাতালের পরীক্ষার ফলাফলে এসেছে পজিটিভ। 

শুধু সোহাগ মিয়া নয়, আরো বেশ কয়েকজনের ক্ষেত্রেই এ রকম ঘটনা ঘটেছে। ফলে ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষ করে পরীক্ষা করিয়েও সঠিক ফলাফল পাওয়ার ব্যাপারে আশ্বস্ত হতে পারছে না চট্টগ্রামের মানুষ। এরই মধ্যে নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে বন্দরনগরী। চলমান এ পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটা পর্যালোচনা কমিটি করে পরীক্ষায় কোথায় গলদ তা চিহ্নিত করার পরামর্শ দিয়েছেন অনেকে।

করোনা আক্রান্ত পরিবারের একজন সদস্য সৌমেন (ছন্দনাম) বলেন, ‘অপর্যাপ্ত ব্যবস্থার কারণে চট্টগ্রামে নমুনা পরীক্ষা করার জন্য একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্যে যেতে হয়। এমনো ঘটছে যে সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে সুস্থ অবস্থায় গিয়ে আক্রান্ত হয়ে ফিরে আসছে মানুষ। এ ঝুঁকি নেয়ার পরও আমরা বুঝতে পারছি না কোথায় এলে সঠিক ফলাফল পাব। এ অবস্থায় পরিবারের দুজন পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে। রিপোর্ট পাওয়ার পরও আমরা ভিন্ন একটি হাসপাতালে পুনরায় পরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছি। এতে পারিবারিকভাবে আমাদের কষ্ট ও ঝুঁকি দুটোই বেড়েছে।’

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত আড়াই মাসে (২৫ মার্চ থেকে ৫ জুন) চট্টগ্রামের চার পরীক্ষাগারে মোট নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ১৩ হাজার ২১৫টি। এর মধ্যে বিআইটিআইডিতে মোট পরীক্ষা হয়েছে ৫ হাজার ৮০৩টি, যেখানে আক্রান্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ১ হাজার ৩৬৬ জন। একই সময় চমেক হাসপাতালে মোট নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ৪ হাজার ২৬২টি, যেখানে আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৯১৮ জন। চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) ২৫ এপ্রিল থেকে ৫ জুন পর্যন্ত পরীক্ষা করা হয়েছে প্রায় তিন হাজারটি নমুনা। এর মধ্যে আক্রান্ত চিহ্নিত হয়েছে ৭৯০ জন। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নভেল করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষার উদ্যোগ নিলেও ত্রুটিপূর্ণ পরীক্ষা সন্দেহের কারণে প্রক্রিয়াটি পিছিয়ে পড়েছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. মোহাম্মদ শামীম হাসান বলেন, ‘যারাই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে কিছুই করছে না। নমুনা যেটা যেভাবে দেয়া হচ্ছে, সেভাবেই রেজাল্ট আসছে। এক্ষেত্রে কোনো পরীক্ষায় রিপোর্টে কনফিউশন তৈরি হলে, সেক্ষেত্রে আগের দেয়া স্যাম্পল সিভিল সার্জন

মহোদয়ের তত্ত্বাবধানে ঢাকায় আইইডিসিআরে পাঠানোর সুযোগ আছে। এ ব্যবস্থাপনাটি মূলত তিনিই করেন।’

দুই সংস্থার পৃথক ফলাফলের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘একই লোকের ভিন্ন রিপোর্ট পাওয়ার ক্ষেত্রে দেখতে হবে কোনো একটি সংস্থার স্যাম্পল গ্রহণের প্রক্রিয়ায় ত্রুটি আছে কিনা। এছাড়া দক্ষতারও ঘাটতি থাকতে পারে। চমেক হাসপাতালে নমুনা পরীক্ষায় করোনা পজিটিভ রেট একটু বেশি, যেটা ৪০ শতাংশের ওপর। বিষয়টি আমরা নজরদারি করছি। এমনকি ঢাকার আইইডিসিআরকেও এ বিষয়টি অবহিত করেছি।’

চমেক হাসপাতালে করোনা শনাক্তের হার অস্বাভাবিক উল্লেখ করে বিষয়টি নজরে এনে ঢাকায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে (আইইডিসিআর) সম্প্রতি অবহিত করেছেন চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন। বিআইটিআইডিতে তুলনামূলক করোনা পরীক্ষা বেশি হলেও আক্রান্ত সংখ্যা ফলাফল আসছে কম। অন্যদিকে চমেক হাসপাতালে নমুনা পরীক্ষা কম হলেও আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বেড়ে যাওয়ায় বিষয়টি স্বাভাবিক মনে করা হচ্ছে না।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, গত ২৫ মার্চ থেকে চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটের বিআইটিআইডির মাধ্যমে চট্টগ্রামে শুরু হয় নভেল করোনাভাইরাসের নমুনা শনাক্তকরণ পরীক্ষা। এরপর ২৬ এপ্রিল থেকে শুরু হয় সিভাসু পরীক্ষাগারে নমুনা পরীক্ষা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ করোনা পরীক্ষার নমুনা পরীক্ষা শুরু করে ১১ মে। নমুনা পরীক্ষাগারে গড়ে প্রায় ২৫ শতাংশ নমুনা জট তৈরি হয়েছে। যার কারণে নমুনার রিপোর্ট পেতে পাঁচ থেকে নয়দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল ও ফৌজদারহাটের বিআইটিআইডিতে সন্দেহভাজনদের নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। তবে সিভাসু ও চমেক হাসপাতালে কোনো নমুনা সরাসরি দেয়ার সুযোগ নেই। বিআইটিআইডি থেকে নমুনা সিভাসুতে পাঠানো হয়। এছাড়া জেনারেল হাসপাতাল এবং নগরীতে স্থাপিত অন্যান্য টেস্টিং বুথের নমুনা চমেকে পাঠানো হয়। এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবে ৮১টি নমুনার মধ্যে ৭৮টি পজিটিভ হওয়ায় তা গ্রহণ করেনি কর্তৃপক্ষ। এটাকে সন্দেহজনক মনে হয়েছে সিভিল সার্জন দপ্তরের কাছে।

বিআইটিআইডির ল্যাব প্রধান ডা. শাকিল আহমেদ খান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বলতে দ্বিধা নেই যে পরীক্ষা প্রস্তুতি আসলে দুর্বল। সময় পাওয়ার পরও দিনে কত পরীক্ষা করা লাগবে, কতগুলো প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা লাগবে কিংবা প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্ট কেমন লাগবে  এসবের কিছুই করা হয়নি। চমেক হাসপাতালের মতো জায়গায় একটি পিসিআর মেশিন ছিল না। করোনা টেস্ট না হলেও এ ইকুইপমেন্ট দিয়ে হেপাটাইসি বিসহ প্রায় ৫০ ধরনের পরীক্ষা করা যায়। বিআইটিআইডিতে ফ্রান্সের সহযোগিতা আছে এবং অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতিরও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আমাদের রিসার্চের কাজটি নিয়মিত হচ্ছে ও এ-সংক্রান্ত ট্রেনিংগুলোও বহু সময় ধরে করছি। বর্তমানে জরুরি ভিত্তিতে যেখানেই পরীক্ষা কার্যক্রম চালু করা হবে, সেখানে ত্রুটি থাকবেই। আমাদের এর মধ্যেই এগোতে হবে। লজিস্টিক সাপোর্ট ও অভিজ্ঞতা গড়ে উঠলে এ ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থার অবসান ঘটবে।’