সম্পাদকীয়

স্কুল ফিডিং প্রশিক্ষণে বিদেশ সফর নাকি সরকারি টাকায় বিনোদন?

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ |

তৈমুর মল্লিক, উপ-সম্পাদক ■ বাংলাদেশ প্রেস

পত্রিকা বলছে, খিচুড়ি রান্না শিখতে বিদেশ সফর। বিষয়টা শুনলেইতো বিরক্তিকর একটি বিষয় সামনে চলে আসে। সমগ্র পৃথিবীতে খিচুড়ি নামক খাবার সম্ভবত ভারত ও বাংলাদেশেই উন্নত স্বাদে তৈরি হয়ে থাকে এবং মানুষ খেয়ে থাকে। তাও সমগ্র ভারত নয়, দক্ষিণ ভারতে এই খিচুড়ি বেশ জনপ্রিয়। আর সেই খিচুড়ি রান্না শিখতে ভারত নামক বিদেশে যেতে হবে কোটি কোটি টাকা খরচ করে? তাহলে কি শুধু খিচুড়ি রান্না শেখা নাকি সাথে আরো কিছু আছে? 

সে যাই হোক, আমার জানামতে বাংলাদেশ স্কুল ফিডিং প্রজেক্ট চালু করেছে প্রায় ১০ বছর হতে চললো। সম্ভবত গত বছর থেকে সেই ফিডিং এ খিচুড়ি যুক্ত হয়েছে। সরকার এসব করেছে শিশুশ্রম বন্ধ করতে, শিক্ষার প্রসার ঘটাতে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে কোন শিশু যেন স্কুল বিমুখ না হয় সেই কারনে। সরকারের চেষ্টার কোন ত্রুটি নেই এই চেষ্টায়। ধরে নেয়া যায়, সরকার এই বিষয়ে যথেষ্ট সফল। 

আমি এটাও জানি যে, গত বছর একদল মানুষ ভারতে গিয়ে ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে শিক্ষা অর্জন করে এসেছে। তাহলে আজ আবার নিশ্চই সেই ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বিদেশ নামক ভারতে যাচ্ছে না। তাহলে কি পত্রিকায় সাংবাদিক যা লিখেছে সেটাই সত্য?

বর্তমান এই প্রজেক্টের প্রজেক্ট পরিচালক জনাব রুহুল আমিন সাংবাদিককে যে তথ্য দিয়েছে সেখানে দেখা যায়, এই বিদেশ সফর তাদের অধিকার।  হোক সেটা খিচুড়ি রান্না শেখার জন্য। তিনি বলেছেন অধিক পরিমাণ সদস্য এই সফরে যুক্ত করাই তার ইচ্ছা। যদিও তাদের প্রস্তাবনায় সদস্য সংখ্যা উল্লেখ করা নেই। তবুও শোনা যায় প্রায় ১ হাজার জন এই সফরে যাচ্ছেন। যাচ্ছেন যে, সেটা হয়তো মোটামুটি নিশ্চিত। ঝুলে আছে পরিকল্পনা কমিশন এখনো ছাড়পত্র দেয়নি। কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিয়ে দিয়েছেন। যেহেতু মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিয়েছেন সেখানে পরিকল্পনা কমিশন নিশ্চই সেটাকে বন্ধ করবেন না। হয়তো কিছু দর কষাকষি চলছে এই যা। দর কষাকষিতে অনাপত্তি মিটে গেলেই, বাংলাদেশ থেকে ১ হাজার জনের বিশাল দল বীরদর্পে এগিয়ে যাবে খিচুড়ি রান্নার প্রশিক্ষণে। 

শুনতে বেশ ভালই লাগছে। মোটামুটি এখন এটা রেওয়াজ হয়ে গেছে, প্রজেক্ট জন্ম নিলেই বিদেশে প্রশিক্ষণ হবেই। তাতে সরকারি কোষাগার ফাকা হোক কিছুই যায় আসে না তাতে। 

করোনা প্রাদুর্ভাবে বিশ্বে চলছে অর্থনৈতিক মন্দা, দেশের স্বাস্থ্য খাত নাজুক, অন্যদিকে বন্যা, চাকরি হারিয়েছে হাজার হাজার মানুষ, হাতে কাজ নেই, এরকম নানান সমস্যার মধ্যেও খিচুড়ি রান্না শিখতে সরকারী কোষাগার থেকে কোটি কোটি টাকা খরচ করা মন্দ নয়। আমরা এতটাই নির্লজ্জ যে, দেশের ক্রান্তিলগ্নেও আমরা সরকারি সম্পদ ভোগ করতে পিছ পা হইনা।  কেউ নেই, কোথাও নেই এমন একজন ব্যাক্তি যে সরকারী কোষাগারকে ছেড়ে কথা বলে। যে কোষাগার তৈরি হয় সাধারণ মানুষের ঘামের টাকায়। 

এখন বলি, আসল কথা। যারা এই বিদেশে যায় শিক্ষা অর্জনের জন্য, তারা বাংলাদেশে সেই শিক্ষার ব্যাবহারিক প্রসার ঘটিয়েছে এমনটি কি কোথাও দেখা গেছে, দুই একটি সভা সেমিনার ছাড়া? 

বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে খিচুড়ি রান্না করুক আর যাই রান্না করুক সেই রান্না কারা করে কেউ খুঁজে দেখেছে? যারা প্রশিক্ষণ নিতে যাচ্ছে তারা কেউ রান্না করবে খিচুড়ি?  ম্যানেজমেন্ট বলতে যে শিক্ষা নিয়ে এসেছে, প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোন স্কুলে সেই ম্যানেজমেন্ট পক্রিয়ার প্রভাব পড়েছে?  

বাস্তব হলো না, কোন প্রশিক্ষণ, কোন ম্যানেজমেন্ট কাজ করে না। 

রান্না করবে গ্রামের রহিমা খালা বা গেন্দু চাচা, ছাগল গরুর মতো লাইন দিয়ে চলবে বিতরণ।  বাজার এসে দিয়ে যাবে ভ্যান রিক্সায় করে ঠিক করে রাখা দালালেরা। দৈনিক ১ হাজার টাকার বাজারের বিল হবে ৫ হাজার টাকা। ১০ জন ছাত্র খাবার খেলে কাগজে কলমে উঠবে ১ হাজার।  এসব কেউ খুঁজে দেখবে না, যারা দেখবে তাদের ঘরে পৌছে যাবে হয় টাকা না হয় বাজার। এর নাম বাংলাদেশ।  

প্রত্যেক প্রজেক্ট এর নামে বিদেশ সফর এই রেওয়াজ আজ অধিকারের পর্যায়ে চলে গেছে। তার প্রমাণ পাওয়া গেছে খিচুড়ি রান্না শেখার প্রজেক্ট পরিচালকের কথায়। 

এর শেষ কোথায় কেউ জানিনা। হয়তো অতি দ্রুত দেখতে পাবো, বাসর ঘরে প্রথম রাতে কি কি করনীয় সেটার প্রশিক্ষণ নিতেও মানুষ বিদেশে যাবে, সেটাও সরকারি টাকায়। হয়তো এই জন্যই আমরা বাংলাদেশি।।