সম্পাদকীয়

শেখ হাসিনার স্টিং অপারেশন!

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২০ |

সায়েদুল আরেফিন

বাংলার গুণীজনেরা বলেন, আষাঢ়ের মেঘ আর মানুষের মন বুঝা সমান কঠিন। এই দুটোই কখন যে কোন দিকে বাঁক নেয় তা বুঝে উঠা চরম কঠিন কাজ, মানুষের পক্ষে। বিশেষ করে অপরাধীরা হয় খুব মিষ্টি কথার ওস্তাদ, আর বাহ্যিক অঙ্গভঙ্গি আর আচরণে হয় খুব অনুগত। গত ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের আগে দলে অনুপ্রবেশকারী বিতর্ক তীব্র হয়। এসময় জানা যায় যে, প্রধানমন্ত্রীর হাতে পাঁচ হাজার নেতার একটি তালিকাও রয়েছে।  তা থেকে অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে নতুন কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদকদের ব্যবস্থা নিতে বলা হয়, সম্মেলনের পরে।     

কিন্তু সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে গিয়ে দেখা যায় তালিকায় দেশের আট বিভাগের জেলাগুলোতে বিভিন্ন দল থেকে আওয়ামী লীগে আসা নেতাকর্মীদের নাম রয়েছে। আবার এ তালিকায় নেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রবেশকারী নেতার নাম। স্বাধীনতাবিরোধী পরিবারের সদস্য, ফ্রিডম পার্টির সাবেক নেতা ছিলেন এমন অনেকের নাম নেই তালিকায়। আবার আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্তই নন, এমন ব্যক্তির নামও রয়েছে তালিকায়। অসম্পূর্ণ এবং ভুল তথ্যও রয়েছে তালিকায়। ফলে এ তালিকা নিয়ে তাঁরা জেলা উপজেলা লেভেলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে অপারগ হন। এ ছাড়া দেখা যায় যে, কেন্দ্র, জেলার এমন প্রভাবশালী নেতা বা মন্ত্রীর ছত্রছায়া তাঁরা অপকর্মে লিপ্ত যে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ঐসব সাংগঠনিক সম্পাদকদের পক্ষে সম্ভব নয়। 

এছাড়াও অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা প্রকাশের পর দেখা গেছে যে, দু-তিন দশক আগে বিভিন্ন দল থেকে আওয়ামী লীগে আসা অনেক নেতা। অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করায় তাঁরা তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কটাক্ষের শিকার হচ্ছেন। দলীয় প্রতিপক্ষরাও এ সুযোগে তাঁদের নানাভাবে নাজেহালের চেষ্টা করছে। 

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয়, জেলার এসব প্রভাবশালী নেতা বা মন্ত্রীগন এমন ক্ষমতাশালী যে, তাঁরা  আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা তৈরি করতে সংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহকে চরমভাবে প্রভাবিত করার সক্ষমতা রাখেন। যেমনটি হয়েছে, সাম্প্রতিক অনলাইন পোর্টালের রেজিস্ট্রেশন দেবার তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে, রাজাকার ও মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরিতে, গ্রহহীনদের তালিকা, ত্রাণের তালিকা, প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহারের তালিকা তৈরিতেও তাঁরা প্রভাব খাটিয়েছেন।  তাই প্রভাবশালী নেতা বা মন্ত্রীগনের ছত্রছায়ায় যারা দেশ জুড়ে অপকর্মে লিপ্ত হয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদকদের পক্ষে মোটেই সম্ভব নয়।    

মূল দল, সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে কমিটি বা পদ বাণিজ্য এমন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যে, সারা দেশে এখন হাজার হাজার খন্দকার মোস্তাকের ছড়াছড়ি। উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ বাণিজ্য হয়েছে ২০ লাখ টাকায়, তা মিডিয়ায় এসেছে। এদের দাপট এতোই বেশি যে, বঙ্গবন্ধুর সহচর, ১৯৭৫ পূর্ববর্তী আর পরবর্তী আওয়ামী লীগ ও তাঁর সহযোগী সংগঠনের নেতা কর্মীরা ছিটকে পড়েছে। এই খবর প্রকাশে অপকর্মের নায়ক প্রভাবশালী নেতা বা মন্ত্রীগন মিডিয়া কন্ট্রোল করতেন বরাট অংকের টাকা দিয়ে। তাই তাঁরা জন্ম দিয়েছেন সাহেদ, পাপিয়া, জি কে শামীমদের, ইজারা দিয়েছেন সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, এমনকি ক্রীড়া ফেডারেশনও।  

অনলাইন পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন খুব শক্তিশালী। এই নাগরিক সাংবাদিকতা না থাকলে অনেক দুর্নীতি বা অপকর্মের খবর চাপা পড়ে যেতো। নাগরিক সাংবাদিকতা কারণেই দেশ বিরোধী অপপ্রচারের কাউন্টার হয়, সাহেদ, পাপিয়া, জি কে শামীমদের আইনের আওতায় নিতে বাধ্য হয় সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর। বালিশ কেলেংকারি,গাছ কেলেংকারি, কম্পিউটার রিপিয়ার-কেনা কেলেংকারি, পর্দা কেলেংকারির, অকবিকে একুশে পদক দেওয়ার মত শত শত কেলেংকারির খবর প্রধানমন্ত্রী জানতে পেরেছেন। তাঁকে ভুল বুঝানো সম্ভব হয়নি। এমতাবস্থায় দেশের নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি শেখ হাসিনা জাতির পিতার অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করতে মনে হচ্ছে স্টিং অপারেশনের আশ্রয় নিয়েছেন।       

এখানে উল্লেখ্য যে, স্টিং অপারেশন হলো একটি প্রতারণামূলক অপারেশন যা কোনও অপরাধে জড়িত ব্যক্তিকে বা তাদের গ্রুপের সদস্যদের ধরার জন্য ডিজাইন করা হয়ে। একটি সাধারণ স্টিং একজন আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তা বা জনসাধারণের সহযোগী সদস্যকে অপরাধী অংশীদার বা সম্ভাব্য শিকার হিসাবে ভূমিকা পালন করে এবং সন্দেহভাজনের অন্যায় কাজের প্রমাণ সংগ্রহের জন্য সন্দেহভাজনের ক্রিয়া সহ এগিয়ে যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ অনেক দেশে স্টিং অপারেশন প্রচলিত। আমেরিকায় এটার প্রয়োগ মৌলবাদী সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করতে খুব ব্যবহার করা হয়। তবে সুইডেনের মতো অন্যান্য অনেক দেশেই এটা অনুমোদিত নয়। 

শুধু গোয়েন্দা সংস্থা নয়, শেখ হাসিনা তাঁর নিজস্ব বাহিনী দিয়ে স্টিং অপারেশন চালিয়ে তথ্য সংগ্রহের ফলেই ফরিদপুরের মত স্থানে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ করা অপকর্মকারীদের জেলে ঢুকাতে পেরেছেন। যদিও অপকর্মকারীদের আশ্রয়দাতা হিসেবে যার নাম এসেছে তিনি একজন সরকার দলীয় এম পি, সাবেক মন্ত্রীও এবং প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় বলে মিডিয়ায় খবর এসেছে। সরকারি দল তথা সরকারের দুর্নীতিবিরোধী  অভিযান নিয়ে মানুষের মনে যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে তা দূর করতে শেখ হাসিনা তাঁর স্টিং অপারেশন চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু দলে খন্দকার মোস্তাকের ছড়াছড়ির কারণে এই অপারেশন গতি পেতে সময় লাগছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা দমবার পাত্রী নন। তিনি দেশের জনগণকে আস্থায় নিয়ে দেশের উন্নয়নে খুব সতর্কতার সাথে আমৃত্যু কাজ করে যাবেন। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ এগিয়ে নিতে, দুহাতে জঞ্জাল সরাবেন খুব সন্তর্পণে।   

আমরা যারে বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ আর সাহিত্যের ছাত্রী শেখ হাসিনাকে চেনার –জানার চেষ্টা করি তাঁদের কাছে বর্তমান সময়ে শামসুর রাহমানের ‘রৌদ্র করোটিতে কাব্যগ্রন্থ’এর ‘রৌদ্র করোটিতে’ কবিতার কথা মনে পড়ে।  

কখনো দেখব স্বপ্ন-কয়েকটি জলদস্যু যেন

অবলীলাক্রমে কাটা মুণ্ডুর চামড়া নিচ্ছে তুলে

অব্যর্থ ছোরার হিংস্রতায়, গড়ায় মদের পিপে

রক্তিম বালিতে আর বর্বর উল্লাসে চতুর্দিকে

কম্পিত পাতার মতো শব্দের ধমকে। কখনোবা

হঠাৎ দেখব জেগে শুয়ে আছি হাত-পা ছড়ানো

বিকেলের সাথে নামহীন কবরের হল্‌দে ঘাসে,

দেখব অঢেল রৌদ্রে ঝল্‌সে উঠে ঝরায় চুম্বন

ওষ্ঠহীন করোটিতে, জানব না সে করোটি কার,

সম্রাট অথবা ভাঁড় যার হোক আমি শুধু একা

দেখব রৌদ্রের খেলা একটি নির্মোহ করোটির

তমসায় দেখব কে ছুঁয়ে যায় কালের বুড়িকে।