সম্পাদকীয়

করোনা পরবর্তীতে বিদেশি বিনিয়োগে সকল সমন্বয়হীনতা দুর করা জরুরি

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২০ |

তৈমুর মল্লিক, উপ-সম্পাদক ■ বাংলাদেশ প্রেস

অন্যকোন দেশের জোয়ার কোন প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই স্থান পূরণ করবে যদি স্থানটি হয় জোয়ার ধারণে অধিকতর গভীর এবং জোয়ার আসার রাস্তাটি হয় প্রসস্ত ও বাঁধাহীন।

যতটা জেনেছি বাংলাদেশি আইন থাইল্যান্ড বা মালয়েশিয়া বা আশেপাশের অন্য যে কোন দেশের তুলনায় অধিক বিদেশি বিনিয়োগ বান্ধব। তারপরেও বিনিয়োগের জোয়ার কোথায় যেন ধাক্কা লেগে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ডেও একটা সময় এমন একটি সময় পার করেছে, কিন্তু তারা বিষয়ের কারণ উদঘাটন করতে প্রচুর রিসার্চ করেছে, বিনিয়োগ আসতে গেলে যতগুলো সেক্টর জড়িত থাকে তারা প্রত্যেকটা সেক্টর সমন্বিত ভাবে বসেছে, সমস্যাগুলো উদঘাটন করেছে এবং আইনকে সমুন্নত রেখে সমস্যাগুলো দুর করেছে। যার সুবাদে তারা অধিকতর সুফল পেয়েছে। যার প্রমাণ আজকের মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ড। 

এখানে কথা হলো, আইনকে যদি সমুন্নত রাখাই হয় দেশের স্বার্থে তাহলে সমস্যা কোথায় ছিলো? সমস্যা ছিলো, অবশ্যই ছিলো, সেই সমস্যায় আমরাও এখন জর্জরিত। সেই সমস্যার নাম সরকারের এক্সিকিউটিভ দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতা প্রকট। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কোন একটি সিদ্ধান্ত কখনই একক কোন দপ্তরের উপর নির্ভর করেনা। যেমন এক হাড়ি ভাত রান্না করতে শুধু ভাত রান্নাটাই বিষয় নয়। 

তার সাথে বাজার, পাত্র, আগুন, পানি, ব্যাক্তি, ব্যাক্তির সুস্থতা ও অসুস্থতা, চুলা, চুলার জ্বালানি, অর্থ, অর্থ আয়ের উৎস ও সময় এসব কিছুই জড়িত। তাই ভাত রান্নাকে শুধু একটি বিষয় চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিলেই হবে বিপদ। হয়তো ঘরে খাবারই জুটবে না। থাকতে হবে অভুক্ত। 

একিভাবে বিদেশি কোন বিনিয়োগ দেশের অভ্যন্তরে সহজে প্রবেশ করতে গেলে সকল দপ্তরের বিশেষ করে - 

১। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয় 

২। পাসপোর্ট ও ভিসা 

৩। এভিয়েশন 

৪। ইমিগ্রেশন 

৫। বেপজা 

৬। এনবিআর 

৭। গোয়েন্দা 

৮। দুইদেশের যৌথ চুক্তি

৯। সার্ভিস/ওয়ার্ক পারমিট 

১০। কাস্টমস 

১১। ইপিজেড 

১২। বাংলাদেশ ব্যাংক 

এই সকল বিষয়ে যৌথ কমিশন সমন্বিত ভাবে কাজ করা অত্যান্ত জরুরি। যার ঘাটতি বিনিয়োগকে এক ধাক্কায় দুরে সরিয়ে দেয় এতে সন্দেহ নেই।  

বিনিয়োগের প্রস্তাবনা, সুবিধা অসুবিধা, স্বার্থসংশ্লিষ্টতা, কাজের অগ্রগতি, বাঁধা, আইনগত সমস্যা, সমাধানের নির্দেশনা, সময়ের ব্যাপারে অনড় থাকা ইত্যাদি বিষয়াদি নিয়ে প্রত্যেকটা দপ্তরে সার্ভার বেজ একই তথ্য সংরক্ষণ থাকা সবচেয়ে জরুরি।  

দুইদিন আগের একটা কথা না বললেই নয়। 

তামাকজাত পণ্যের উপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা ও একদিন না যেতেই অন্য মন্ত্রনালয়ের "না" বোধক সিদ্ধান্ত। বিষয়টি একটি দেশের দুইটি মন্ত্রনালয়ের কতটা সমন্বয়হীনতা থাকলে সেটা হাস্যকর হতে পারে তারই উদাহরণ। নিশ্চিত ভাবে বলা যায় বিষয়টি ঘোষণার পূর্বে দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কোন প্রকার সমন্বিত পর্যালোচনা হয়নি। অথচ তারা জানেন বিষয়টি শুধু এই দুইটি মন্ত্রনালয়ের মধ্যেই নয় এরসাথে যুক্ত পরিকল্পনা সহ জন নীরাপত্তা সহ স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এই পক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত। কারণ এখানে হাজার হাজার মানুষের জীবন জীবিকা জড়িত।  অন্যসবগুলো বিষয় না হয় বাদ দিলাম, মূখ্য ২টি মন্ত্রণালয় কিভাবে সমন্বয় ছাড়া সরকারকে এমন হাস্যকর পরিবেশের মুখোমুখি করতে পারে। 

এটাতো গেলো সমন্বয়ের কথা, এই ঘোষণার সাথে সাথে সরকার কত টাকা রাজস্ব হারাবে, কত মানুষ একসাথে বেকার হবে, অন্যদেশের দিকে চোরাই পথে কতমানুষ ঝুকে পড়বে, বিভিন্ন বিষয়ে যৌথ কোন সার্ভারবেজ ডাটা আদানপ্রদান এবং সেই ডাটা সংরক্ষণ, পর্যালোচনা প্রতিবেদন কিছুই নিজেদের মধ্যে নেই। তাই একটি আদেশে বিভিন্ন সেক্টরে কতবড় গ্যাপ তৈরি হয় যা পরবর্তী সময়ে নানামুখী সমস্যার সৃষ্টি করে তা কল্পনারও বাইরে। 

এখন আসি নির্ধারিত আলোচনায়। 

সার্ভিজ/ওয়ার্ক পারমিট, সময় ও টাকা এই ৩ টি বিষয় একে অন্যের সাথে জড়িত। 

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ বিনিয়োগ প্রথায় কেন আসে? বা আমদানি রপ্তানিতে কেন যায়? 

কাঁচামাল ও তৈরি বস্তু বিষয় ২ টির মধ্যে কাঁচামালের কথা একটু ভিন্ন। তবে বাংলাদেশ যেহেতু তৈরি বস্তু রপ্তানি নির্ভর সেহেতু তৈরি বস্তুতেই কথা বলি। 

বাংলাদেশের কি ধারণা, বাংলাদেশ যে সকল তৈরি বস্তু রপ্তানি করে সেটা তৈরি করার যোগ্যতা অন্যদেশের নেই? অবশ্যই আছে, এবং আরো মানসম্মত ভাবেই তারা তৈরি করতে পারে। কিন্তু কস্টিং হলো আসল ব্যাপার। যখন কেউ দেখে তার তৈরি করার চেয়ে আমদানিতে সাশ্রয় তখন সে সেই পথ বেছে নেবে এটাই স্বাভাবিক। বিষয়টি নির্ভর করে শ্রমের মূল্যের তারতম্যের উপর। সেইদিক থেকে বাংলাদেশে যথেষ্ট পরিমান বিনিয়োগ সুবিধা রয়েছে। কারন একটাই। সেটাহলো শ্রমের মূল্য আন্তর্জাতিক বাজার দরের চেয়ে অনেক কম। 

কিন্তু তারপরেও মুখ ফিরিয়ে নেয় বিনিয়োগ যারা করবেন তারা। প্রশ্ন ওঠে কারণ কি! 

কারণ অনুসন্ধানে দেখাযায় এক কথায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সংশ্লিষ্ট সাপোর্টিং এলিমেন্টের ডাটা প্রসেজিং অর্থাৎ তথ্যের ঘাটতি রয়েছে পর্যাপ্ত। একটি বিনিয়োগ হতে গেলে যতোগুলো এলিমেন্ট তার সাথে সংশ্লিষ্ট তাদের প্রত্যেকের ইন্ডিবিউজাল আদেশ, নিষেধ, সুপারিশ ও সমাধান যার‍ যার বাক্স বন্ধি হয়ে পড়ে থাকা। কেউ কারো ডাটা প্রসেজিং বা তথ্যের ব্যাপারে জানেই না, ফলে একজনের সিদ্ধান্ত চলে যায় অন্যের বিপরীতে। পজেটিভে থাকার কোন সম্ভাবনাই থাকে না। কারণ- 

১। বিনিয়োগ হবার আগেই চুক্তিপত্র চূড়ান্ত হবার আগেই যার যার নিজের অংশের হিসাব নিকাশ বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত। 

২। সামগ্রিক সমন্বয়হীনতার কারনে বিনিয়োগকারীগণ ঘাটে ঘাটে পানি খেয়ে বেড়ায়।

৩। সময় ও টাকা এই দুইটি চলে যায় নাজুক অবস্থায়।

৪। কাস্টমস/ইপিজেড এলাকায় হয়রানি ফলে প্রত্যেকদিন খরচের পরিমান বৃদ্ধি।

৫। ভিসা জটিলতা

৬। সার্ভিস/ওয়ার্কপারমিট জটিলতা

৭। ট্যাক্স নিয়ে জটিলতা

৮। যৌথচুক্তির বিষয়ে তথ্যের জটিলতা 

ইত্যাদি ইত্যাদি মার প্যাচে বিনিয়োগ যে খরচ বাঁচানোর জন্য হবে সেটার চেয়ে বেড়ে যায় বহুগুণ।  ফলে তারা পালাতে পারলে বাঁচে।  

উক্ত সকল কিছুই সৃষ্টি হয় সামগ্রিক দাপ্তরিক তথ্যের ঘাটতির কারণে। একজনের তথ্য অন্যজনের হাতে না থাকার কারনে। 

এর বাইরে রয়েছে সে বাংলাদেশে যতদিন থাকবে তার থাকা সহ তার সংস্কৃতির একটি নীরাপদ বলয় তৈরি করে দেয়া, সেতো বিনিয়োগ করতে এসেছে, চাকর নয় তাই তাকে যথেষ্ট সম্মান দেখানো ইত্যাদি বিষয়গুলোতো রয়েছেই।  

যাইহোক করোনা পরবর্তী বাংলাদেশ গড়তে এসব দিকে নজর না দিলে বুমেরাং হতে পারে। যে ধারায় অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছিলো সেই ধারায় ফিরিয়ে আনতে যৌথ সমন্বয়ে এবং অবশ্যই প্রয়োজনীয় তথ্য সার্ভার বেজ নেটওয়ার্ক এর মাধ্যমে সরকারের প্রত্যেক এলিমেন্ট এর নিকট থাকা জরুরি।  কোন অসুবিধা হলেই যেনো তথ্য সংগ্রহ করতে করতে শতাব্দী পার না হয়ে যায়। কাঁচামাল সহ সকল লজেস্টিক সাপোর্ট অতি সংক্ষিপ্ত সময়ে হাতে পেয়ে সময় অনুপাতে টাকা বুঝে নিতে ও দিতে কোন প্রকার লম্বা প্রসেস অর্থাৎ আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় না পড়তে হয়।  

দেশের মধ্যে কে প্রবেশ করেছে, কার মাধ্যমে করেছে, কি করতে এসেছে, কতদিনের জন্য এসেছে, কতটাকার লেনদেন হবে, তার জন্য আর কি কি সাহায্যকারী এলিমেন্ট প্রয়োজন, তাদের অবস্থান কোথায়, ইত্যাদি বিষয়ের সকল তথ্য সার্ভার বেজ নেটওয়ার্ক এর মাধ্যমে সকলের নিকট সংরক্ষণ ও তার টাইম টু টাইম আপডেট যদি হয়, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা যদি না হয়, কাজ শুরুর পূর্বেই টেবিলের গুপ্ত ড্রয়ার যদি না ওপেন হয় তাহলে বিনিয়োগ বৃদ্ধি না পাওয়ার কোন কারনই নেই।  

আমাদের শ্রম দিয়েই আমাদের দেশ দাঁড় করাতে হবে, তৈরি করতে হবে নতুন নতুন বিনিয়োগের পথ। তাহলেই হয়তো টিকে থাকবে বাংলাদেশ।