সম্পাদকীয়

দেশ বিভাজনে স্নায়ুযুদ্ধের চাপ ভারত কতটা বহন করতে সক্ষম?

প্রকাশ: ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯

তৈমুর মল্লিক, উপ-সম্পাদক ■ বাংলাদেশ প্রেস

যদি ভুল না বলি সেভিয়েত ইউনিয়ন ছিলো ১৫ টি রাজ্যের একটি বন্ধন।  

১.  আজারবাইজান, ২.  আর্মেনিয়া, ৩.  ইউক্রেন, ৪.  এস্তোনিয়া, ৫.  উজবেকিস্তান, ৬.  কাজাখস্তান, ৭.  কিরগিজিস্তান, ৮.  জর্জিয়া, ৯.  তাজিকিস্তান, ১০.  তুর্কমেনিস্তান, ১১.  বেলারুশ, ১২.  মলদোভা, ১৩.  রাশিয়া, ১৪.  লাতভিয়া ও ১৫। লিথুয়ানিয়া। 

কিন্তু ১৯৯১ সালে এই বন্ধন ভেঙে যার যার তার তার হয়ে গেলো। ১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীর ভেঙ্গে যাওয়ার পর পূর্ব ইউরোপের বহু দেশে কমিউনিজমেরও পতন ঘটেছিলো। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন তখনো টিকে ছিলো বহালতবিয়তে। কমিউনিষ্ট পার্টির নেতা মিখাইল গর্বাচভ দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছিলেন তার সম্রাজ্য। কিন্তু কেন এমন হয়েছিলো সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বেরিয়ে আসবে পৃথিবী শাসন করার দুই পরাশক্তির টানাপোড়েন গল্প। যার একদিকে যুক্তরাষ্ট্রে অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন।  বেরিয়ে আসবে মার্কিনীদের ছুড়ে দেয়া স্নায়ুযুদ্ধের নানান কাহিনি। উদ্দেশ্য একটাই। সেভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে দিতে পারলেই শক্তিগুলো সব ভেঙে ছোট ছোট হয়ে যাবে।  

গল্পের শেষাংস ছিলো বড় মজার।  শোনা যায় সেভিয়েত ইউনিয়নের ৩ নেতা প্রচুর মদ খেয়ে মদ্যপ অবস্থায় সেভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে ফেলার দলিলে স্বাক্ষর করেন। কিন্তু বিষয়টা তেমন নয় বলেই ভিবিন্ন ভাবে উল্লেখ রয়েছে। তারা যে স্থানে বসে ৩ জনে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলো, সেই পরিবেশটা ছিলো মদ্যপানের জন্য উপযোগী এবং সামাজিক ভাবে ন্যায়সংগত। কিন্তু তারা সেটা করেন নি, তারা নাকি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেই হালকা কিছু মদ পান করেছিলেন। 

যাইহোক এটাও একটি স্নায়ু যুদ্ধের কৌশল সেটা বলাই যায়।  কারণ ১৯৯১ সালের ৭ই ডিসেম্বর রাশিয়ার নেতা বরিস ইয়েলৎসিন, ইউক্রেনের নেতা লিওনিদ ক্রাভচুক এবং বেলারুশের নেতা স্ট্যানিস্লাভ শুশকেভিচ পূর্ব বেলারুশের এক বিরাট খামারবাড়ীতে বৈঠকে বসেন।

বৈঠকটি ডেকেছিলেন বেলারুশের প্রেসিডেন্ট স্ট্যানিস্লাভ শুশকেভিচ। ইউক্রেনের নেতা লিওনিদ ক্রাভচুক এবং রাশিয়ার নেতা বরিস ইয়েলৎসিন যোগ দিলেন তার সঙ্গে। ইউক্রেন ততদিনে স্বাধীনতা ঘোষণা করে দিয়েছে। কিন্তু বেলারুশ তখনো সেরকম ঘোষণা দেয়নি। 

এদের মধ্যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিনের খুবই কাছের বন্ধু ছিলেন সেই সময়ের মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুস। এবং সেটা সকলেই জানতো। সেটা সহজে মেনেও নিয়েছিলো। তারমানে ভিতরে ভিতরে মার্কিনীদের প্রিয়ভাজন আরো অনেক নেতাই তখন সেভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন প্রজাতন্ত্রের দায়িত্বে।

বৈঠকে বসা ৩ নেতা ভালো করেই জানতো সেভিয়েত প্রেসিডেন্ট গর্বাচভকে না জানিয়ে এরকম একটা বৈঠকে বসা ছিলো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ইচ্ছা করলেই "গর্বাচভের নির্দেশে সোভিয়েত গুপ্ত সংস্থা কেজিবির এজেন্টরা তাদের গ্রেফতার করতে পারতো। কিন্তু করেনি। কারণ এখানেই সেই স্নায়ুযুদ্ধের মাজেজা লুকিয়ে আছে।  

বেলারুশের গুপ্তচর সংস্থার প্রধান নিয়মিত যোগাযোগ রাখছিলো বরিস ইয়েলৎসিনের গুপ্তচর সংস্থার সঙ্গে। আর  বেলারুশের প্রেসিডেন্ট ছিলো স্ট্যানিস্লাভ শুশকেভিচ। সে নিজেই বাকি দুইজনকে ডেকে নিয়ে এসেছে বেলারুশে। আর স্থানটাও সামাজিক ভাবে মদের স্থান। মাতাল হতে সময় লাগবে মাত্র ২ সেকেন্ড।  

যাইহোক চুক্তি পর্ব শুরু হলো, শুধু একটি লাইন বলি - যে লাইনটাই নাকি চুক্তি স্বাক্ষরে সকলকে দ্বিধাহীন করে তুলেছিলো। 

"ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আন্তর্জাতিক আইনের বিষয় হিসেবে ইউনিয়ন অব সোভিয়েত সোশ্যালিষ্ট রিপাবলিকস বা ইউএসএসআর এর কোন অস্তিত্ব আর নেই"। 

উল্লেখিত লাইনটি এবং ১৪টি অনুচ্ছেদ সকলের পছন্দ হওয়ায় এতোদিনের সেভিয়েত ইউনিয়নের সমাধি রচিত হয়েগেলো।  এখন পালা সমগ্র বিশ্বকে বিষয়টি জানিয়ে দেয়া।  

স্ট্যানিস্লাভ শুশকেভিচের দ্বায়িত্ব পড়লো বরিস সেভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচভকে জানানো ও  বরিস ইয়েলৎসিনের দ্বায়িত্ব হলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ কে জানানো। 

প্রশ্নহলো - জর্জ বুশকে কেন জানাতে হবে? তিনিতো মার্কিন প্রেসিডেন্ট। কারণ ৩ জনের ২ জন বরিস ইয়েলৎসিনকে বলেছিলেন আপনার প্রিয় বন্ধু জর্জবুশকে আপনি জানান।  তিনি জানিয়েওছিলেন। এবং জর্জবুশ সেটি মেনে নিয়েছিলেন একবাক্যে।  এরপর ১৯৯১ সালের ২৫শে ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট গর্বাচভ পদত্যাগ করলেন। বিলুপ্ত হয়ে গেল সোভিয়েত ইউনিয়ন।

এইছিলো মোটামুটি গল্প। মার্কিন এখন এশিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে।  চীন, উত্তর কোরিয়া, ভারত, পাকিস্তান এই নিয়ে মোটামুটি যা না তাই অবস্থা এখন। বিশেষ করে চীন আর ভারত সেই ৯১ এর তুলনায় এখন অনেক বেশি সমস্যার কারন।  

চীনের মধ্যে মার্কিন সহজে প্রবেশ না করতে পারলেও ভারত তার জন্য মোক্ষম একটি স্থান। অন্যদিকে চীনের বিপরীতে ভারত, পাকিস্তানের বিপরীতে ভারত। পিকুলিয়ার একটি ভূরাজনিতি নিয়ে চলমান এখন এশিয়া বিশেষ করে দক্ষিন এশিয়া।  যেখানে ৩ টি রয়েছে অফিশিয়াল আণবিক শক্তিশালী দেশ। এই অঞ্চলে শক্তি স্থাপনের জন্য মার্কিনিদের ততোক্ষণ চীন বাঁধা দেবেনা যতক্ষন সে ভারতের বিপক্ষে কাজ করবে। আবার পাকিস্তান কিছুই বলবে না কারণ সবারই জানা।  

এমন অবস্থায় ভারতের ক্ষমতায় বিজেপি। যাদের অস্ত্রের মূল যোগানদাতা ইসরায়েল। কাস্মীর নিয়ে ভারতের নীতি পরিবর্তনে মার্কিনীদের তেমন কোন বাঁধা দিতে দেখা যায়নি। আর সন্দেহটা সেখানেই। মোদি সরকার মনে হয় নিজেদের উপর ভরসা একটু বেশি করে ফেলেছে তখন। পাকিস্তান চুপ, চীন চুপ। এরমধ্যেই ভারতকে অসাম্প্রদায়িক হতে হিন্দুস্থান করতে উঠেপড়ে লেগেগেছে মোদি সরকার। অমিত সাহা এককাঠি উপরেই হাঁটছেন।  

নিশ্চই কংগ্রেস চুপ করে বসে থাকবে না। কারণ অসম্প্রদায়িক চিন্তা ভাবনা তাদের পূর্বপুরুষের।  সব মিলিয়ে পালে হাওয়া লেগেছে ভারতে।  

এরপর যে দৃশ্য সামনে আসছে সেটা সোভিয়েত ইউনিয়নের সেই শুরুর কাহিনি। হয়তো মধ্যপথে চলেও এসেছে।  শেষটায় কবে কখন কোন স্থানে মিলিত হবে কোন কোন নেতা চুক্তি স্বাক্ষর করার জন্য সেটা কে বলতে পারে।  তবে ইঙ্গিত তেমনি সেটা অনেকটাই পরিস্কার হয়ে এসেছে। চলছে স্নায়ু যুদ্ধের প্রচন্ড চাপ ভারত জুড়ে তথা দক্ষিন এশিয়া জুড়ে।  ভারত কতটা সেই চাপ সহ্য করে দাঁড়িয়ে থাকবে নাকি আবার ৪৭ সালের জন্ম দেবে সেটাই দেখার বিষয়।