সম্পাদকীয়

বাক স্বাধীনতার "দুই চোখ"

প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯     আপডেট: ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ |

তৈমুর মল্লিক, উপ-সম্পাদক ■ বাংলাদেশ প্রেস

দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকা মানবতা বিরোধী কাদের মোল্লাকে শহীদ লিখেই ফেঁসে গেছে। যদিও দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকা স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়  মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে কয়েকজনকে বিচারে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ফাঁসি কার্যকর হবার পরেও শহীদ বলেই উল্লেখ করে আসছে। এবারই জনতা ক্ষেপে গিয়ে আইন হাতে তুলে নিলো। এরপর কি হবে সেটা আইন দেখবে। তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে আবার জেগে উঠেছে সেই পুরাতন শব্দ, যার নাম "বাকস্বাধীনতা"।  কেউ বলছে গেলো গেলো সবই গেলো, সরকারের চোদ্দগুষ্টি উদ্ধার করছে। কেউ বলছে ঠিকই আছে। 

"হাসি পায় তখন যখন দেখি দেশের প্রধানমন্ত্রীকে কেউ একজন সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রকাশ্যে গালি দিচ্ছে, ব্যাঙ্গ করছে, ট্রল বানাচ্ছে। অন্যদিকে বলছে বাকস্বাধীনতা নেই"। আর আমি বলছি, "বাকস্বাধীনতার দুই চোখ"।

শিরোনাম যখন দুই চোখ তখনতো প্রমান করতেই হবে, বাকস্বাধীনতার  দুই চোখ কি করে হলো।

১ম চোখঃ 

ধারনা করা হয় ৬ষ্ঠ খৃষ্টপূূর্বের শেষে বা ৫ম খৃষ্টপূূর্বের প্রথমার্ধে প্রাচীন এথেন্সের গনতান্ত্রিক মতবাদে বাক স্বাধীনতার প্রতিফলন ঘটেছিল। পরে প্রজাতন্ত্রী রোমানের  মূল্যবোধে বাকস্বাধীনতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।

ইংল্যান্ডের সংসদে ১৬৮৯ বিলে  সাংবিধানিকভাবে বাকস্বাধীনতাকে অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৭৮৯ তে ফরাসি বিপ্লবের সময় নাগরিকের অধিকার মুলক আইন বলবৎ করা হয়, যেখানে বাক স্বাধীনতাকে অনিবার্য অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। 

সেই ঘোষণায় ১১ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়: "নিজের চিন্তাভাবনা ও মতামতকে মুক্তভাবে বিনিময় করা  নাগরিকের মুল্যবান অধিকার। প্রত্যেক নাগরিক স্বাধীনতা অনুযায়ী বলতে, লিখতে এবং তথ্য প্রকাশ করতে পারে কিন্তু সেই স্বাধীনতার অপব্যবহার করলে তার জন্য সে দায়ী থাকবে, আর এই অপব্যবহার আইন দ্বারা সংজ্ঞায়িত থাকবে।" 

১৯৪৮ সালে মানবাধিকার সনদে ১৯ নং অনুচ্ছেদ সংযোজিত হয়। যেখানে বলা হয়েছেঃ

প্রত্যেকের অধিকার আছে নিজের মতামত এবং অভিব্যক্তি প্রকাশ করার। এই অধিকারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে নিজের স্বাধীনচেতায় কোনো বাধা ব্যতীত অটল থাকা।পুরো বিশ্বের যে কোনো মাধ্যম থেকে যে কোনো তথ্য অর্জন করা বা অন্য কোথাও সে তথ্য বা চিন্তা জ্ঞাপন করার অধিকার।

আধুনিক সময়ে এসে এই বিষয়গুলি প্রবেশ করেছে একটি নামে, যার নাম - "মানবাধিকার"। আন্তর্জাতিক বেসামরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্মেলনের ১৯ নং অনুছেদ, ইউরোপীয় মানবাধিকার সম্মেলনের ১০ নং অনুচ্ছেদ, মার্কিন মানবাধিকার সম্মেলনের ১৩ নং অনুচ্ছেদ এবং আফ্রিকান জন ও মানবাধিকারের ৯ নং অনুচ্ছেদে এই অধিকারকে সন্নিবেশিত করা হয়েছে।

জন মিল্টনের একটি গ্রন্থে পাওয়া যায়, এটা একটি বহুমুখী অধিকার। যেখানে শুধুমাত্র চিন্তাভাবনা ছড়িয়ে দেওয়াটাই মুখ্য নয়। এর তিনটি স্বতন্ত্র্য বিষয় আছেঃ 

১। তথ্য এবং ধারণা অন্বেষণ করার অধিকার

২। তথ্য এবং ধারণা পাওয়ার অধিকার

৩। তথ্য এবং ধারণাকে ছড়িয়ে দেওয়ার অধিকার

আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক এবং জাতীয় মানদন্ডে এই বাকস্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। যেকোনো মাধ্যম, মৌখিক, লিখিত, প্রকাশনা, ইন্টারনেট দ্বারা অথবা চিত্রকলার মাধ্যমে এই অভিব্যক্তির স্বাধীন প্রকাশ করা যেতে পারে। 

২য় চোখঃ 

আইনগত ব্যবস্থা বিশেষ করে জননিরাপত্তা আইন  কখনও কখনও বাকস্বাধীনতার নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে যায়। হয়ে যায় বললে ভুল হবে, হবেই।  বিশেষ করে যখন বাকস্বাধীনতা অন্যান্য স্বাধীনতাগুলোর সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে, যেমন মর্যাদাহানি, কুৎসা রটানো, পর্নোগ্রাফি, অশ্লীলতা, আক্রমণাত্মক শব্দ এবং রাষ্ট্রের বিপক্ষে যায় এমন বাকস্বাধীনতার সাথে অন্যান্য স্বাধীনতার দ্বন্দ্ব দেখা যায়। আধুনিক সময়ে এসে যা বিধ্বংসী রূপে আবর্তিত হতে দেখা যায়।  

জন স্টুয়ার্ট মিল ১৮৫৯ সালে তার লেখা গ্রন্থ "অন লিবার্টি"তে এবং ১৯৮৫ সালে জোয়েল ফাইনবার্গ বাকস্বাধীনতার মধ্যে ২ টি শব্দ নিয়ে আসেন। 

১। অপকার নীতি (Harm principle) [ জন স্টুয়ার্ট মিল ] 

২। অবমাননা নীতি (offense principle) [ জোয়েল ফাইনবার্গ ] 

জন স্টুয়ার্ট মিল এর অপকার নীতির কিছু কিছু অংশ সব বিষয়কে পরিষ্কার করেনি বা উল্লেখ করেনি এমন দ্বিমত নিয়েই জোয়েল ফাইনবার্গ এতো বছর পরে এসে অবমাননা নীতি সামনে নিয়ে আসলেন। এখানে জন স্টুয়ার্ট মিলের চেয়ে জোয়েল ফাইনবার্গ এককাঠি উপরে শক্ত ও অনমনীয় স্থানে থেকেই মতামত দিয়েছেন।  তিনি বলেছেন - "কিছু ধরনের মত প্রকাশ আইনের দ্বারা নিষিদ্ধ হয় যেগুলো খুবই অবমাননাকর হয়। কিন্তু কোন ব্যক্তিকে অবমাননা করা, কারও অপকার করার চেয়ে কম গুরুতর বলে অপকার করার শাস্তি বেশি হওয়া উচিৎ। 

আসলে এই দুইজন ব্যাক্তির মতামত দেবার সময়ের মধ্যে লম্বা একটা ব্যবধান রয়েছে।  আর তাই ডালপালা, আধুনিকতা, বাকস্বাধীনতার ধরণ, চাওয়া পাওয়ার ধরণ সব কিছুর মধ্যে বিরাট একটি পরিবর্তন আসাটাই স্বাভাবিক। আর তাই হয়তো জোয়েল ফাইনবার্গ এমনটা ভাবতে বাধ্য হয়েছিলেন।  অপকার নীতিতে বলা হয়, "অন্য কারও ক্ষতি করে না এরকম সব কাজ করার স্বাধীনতাতেই প্রকৃত স্বাধীনতা নিহিত থাকে। 

তাই প্রত্যেক ব্যক্তিরই প্রাকৃতিক অধিকারের চর্চার কোন সীমাবদ্ধতা নেই যদি না তার দ্বারা সমাজের অন্য কোন ব্যক্তির একই রকম অধিকার অর্জনকে ব্যাহত হয়। এই সীমাবদ্ধতাসমূহ কেবল মাত্র আইন দ্বারাই নির্ধারিত করা যাবে।"

That the only purpose for which power can be rightfully exercised over any member of a civilized community, against his will, is to prevent harm to others.

বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে যেটা দাঁড়ায়, স্বাধীনতা মানেই যা ইচ্ছা তা নয়। বাকস্বাধীনতা মানেই যা ইচ্ছা তা বলা নয়। প্রতিটি বিষয় আইনের নিকট জবাবদিহি করতে বাধ্য।  অবমাননা নীতিতে বলা হয়, "কোন কোন ক্ষেত্রে মানসিক ও সামাজিক অপকার শারীরিক অপকারের সাথে তুলনা করা হতে পারে। অবমাননা আবশ্যিকভাবে অপকার সাধন না করলেও অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। অবমাননা তখনই অপকার নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, কেবল যখন এর ফলে অপকারও সাধিত হয়।যাইকিছু হোক সারাংশ এটাই যে, মানুষের বাকস্বাধীনতায় ঠিক কতটা সীমাবদ্ধতা আরোপ করা উচিৎ?  এই নৈতিক প্রশ্নটি অপকার নীতি ও অবমাননা নীতি উভয়ের মধ্যেই বলা আছে । 

যদি কোন ব্যক্তির স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার হিংস্রতা বা অনিষ্টকর্ম বা অনুরূপ ক্ষতির উৎপত্তি ঘটায়, তবে এটাকে অপকার নীতির আওতায় ধরা হয়। যদি এই বাকস্বাধীনতা - মত প্রকাশের অধিকার দ্বারা জাতীয় পতাকা পোড়ানো, বিতর্কিত মিছিলের উদ্ভব ঘটে, তাহলে তাকে সাধারণত অবমাননা নীতির আওতায় ধরা হয় হয়। আর এই উভয় ক্ষেত্রেই বাকস্বাধীনতা আইনের কাছে জবাবদিহি অবশ্যই করতে বাধ্য । 

এখানেই শেষ নয়। জ্যাসপার ডুমেন, বার্নার্ড হারকোর্ট আরো অনেকেই অনেক ভাবে বাকস্বাধীনতা, অপকার নীতি ও অবমাননা নীতি নিয়ে কথা বলেছেন।  কিন্তু মোদ্দাকথা হলো,  এটি একটি সময়ের সাথে, সামাজিক প্রেক্ষাপটে, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মানুষকে নিরাপদ রাখতে একটি পরিবর্তিত অধ্যায়। 

বাকস্বাধীনতার সীমাবদ্ধতায় অপকার নীতি ও অবমাননা নীতির ব্যাখ্যা সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন ভিন্ন হয়েছে। যেমনঃ

১। রাশিয়ায় অপকার ও অবমাননা নীতিকে এলজিবিটি সম্পর্কিত মত প্রকাশ ও আন্দোলনগুলোকে বন্ধ করার জন্য রাশ্যান এলজিবিটি প্রোপাগান্ডা আইন এর ন্যায্যতা প্রতিবাদনের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। 

২। কয়েকটি ইউরোপীয় রাষ্ট্রে যেখানে সেই সব রাষ্ট্রে বাকস্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার জন্য গর্ব করা হয়, সেখানেও হলোকাস্ট ডিনায়াল জাতীয় মত প্রকাশ করা (যেখানে বলা হয় ইহুদি হত্যা নাজি জার্মানির উদ্দেশ্য ছিলনা ইত্যাদি) নিষিদ্ধ। যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, চেক রিপাবলিক, ফ্রান্স, জার্মানি, হাঙ্গেরি, ইজরায়েল, লিকটেনস্টাইন, লিথুনিয়া, নেদারল্যান্ড, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, স্লোভাকিয়া এবং সুইজারল্যান্ড।

ড্যানিশ কার্টুনিস্ট কার্ট ওয়েস্টারগার্ড নবী মুহম্মদ (সঃ)কে নিয়ে একটি বিতর্কিত কার্টুন তৈরি করেছিলো। যেখানে নবীর পাগড়িতে একটি বোম্ব রাখা ছিল। যা কিনা সারা দুনিয়ায় প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।

রাজনৈতিক বিজ্ঞানের প্রফেসর এবং লেখক নরমান ফিংকেনস্টাইন তার নিজের মতামত ব্যক্ত করে বলেন, মুহম্মদ (সঃ)কে নিয়ে শার্লে হেবদোর মর্যাদাহানিকর কার্টুনগুলো বাকস্বাধীনতার সীমাকে অতিক্রম করেছে, আর তিনি সেই কার্টুনগুলোকে জুলিয়াস স্ট্রেইচারের কার্টুনগুলোর সাথে তুলনা করেন, যাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তার লেখা ও আঁকা প্রকাশের জন্য ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।

২০০৬ সালে ফরাসী রাষ্ট্রপতি জ্যাক শিরাক শার্লে হেবদোর সেই প্রকাশনাটির দ্বারা এভাবে প্রকাশ্য উত্তেজনা সৃষ্টির নিন্দা করেন। তারমানে রাষ্ট্র যদি মনে করে কোন উক্তি জনমনে অসন্তোষ তৈরি করবে বা করতে পারে, রাষ্ট্র যদি মনে করে কোন বিষয় মানুষের ক্ষতি করতে পারে তাহলে সেখানে আইনের উপিস্থিতি সে ঘটাতে বাধ্য। 

কথায় কথায় অনেকেই আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বাকস্বাধীনতার গুরু বলে মানে। কিন্তু তাদের আদালত বলছে, "কটূক্তি অনুমোদিত হবে, যদি না তা আসন্ন সহিংসতা সৃষ্টি করে"। অর্থাৎ ঘুরে ফিরে যে লাউ সেই কদু।  তাহলে পরিসংখ্যান কি দাঁড়ায়? আমি যা ইচ্ছা তাই করতে পারি বা বলতে পারি?  কখনই না। স্বাধীনতা বা বাকস্বাধীনতা মানেই যা ইচ্ছা তাই বলা ও করা নয়, অন্তত বিষয়টি আইনের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। আর এটি অবশ্যই সময়, চাহিদা, এবং নিরাপত্তার সাথে তালমিলিয়ে পরিবর্তিত একটি অধ্যায়।  এই ক্ষেত্রে মানুষ তার স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতা প্রয়োগে বা ব্যবহারে যতটা সচেতন, আইনও ততোটাই তার প্রতি নমনীয়।