সম্পাদকীয়

আমাদের সংস্কৃতির মৃত্যু হয়েছে আগেই, চলছে সৎকার

প্রকাশ: ১১ ডিসেম্বর ২০১৯

তৈমুর মল্লিক, উপ-সম্পাদক ■ বাংলাদেশ প্রেস

বাংলা সংস্কৃতির মৃত্যু হয়েছে অনেক আগেই। ধরে নিতে পারি ৯০ দশকের পর থেকেই। যেদিন থেকে বাংলাদেশে যোগাযোগের ক্ষেত্রে আধুনিকতা প্রবেশ করেছে অফিশিয়াল ভাবে সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিলো বাংলা সংস্কৃতির ধুকে ধুকে পথ চলা। 

আধুনিক যোগাযোগের কোন মাধ্যম বাংলাদেশিদের কর্তৃক সৃষ্টি হয়নি। সেই সুযোগও ছিলোনা। বাধ্যহয়ে আমরা লুফে নিয়েছি তাদের। 

আধুনিক যোগাযোগের সৃষ্টি যাদের হাত হতে এসেছে তারা তাদের সৃষ্টির সাথে সাথে নিজেদের তৈরি করেছে বানিজ্যিক হিসাবে। অদ্ভুত ভাবে তারা হয়েছে বানিজ্যিক, আর আমরা হয়েছি পরশ্রীকাতর। সময়টা তখন এমন যে, আমাদের অন্যকিছু আর ভাবার কোন অবকাশই ছিলনা। কারণ বাংলাদেশ তখন ভাইটাল সময়ে দাঁড়িয়ে। একদিকে দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে, অন্যদিকে ১০ শতাংশ মানুষের হাতে দেশের অর্থনীতি। চোখ বন্ধ করে, কোন প্রকার ন্যায়নীতির ধার না ধেরে তারা হয়ে গেলো এজেন্ট। ছিলনা কোন নীতিমালা, ছিলো না কোন আদর্শ, ছিলোনা কোন পাপ তাপ পরিতাপের বাদ বিচার। 

একদিকে দেশের চাই উন্নয়ন, অন্যদিকে প্রায় রক্ষনশীল বাংলাদেশ। বলাচলে একটি উভয়সংকটে বাংলাদেশ। আধুনিক যোগাযোগ সৃষ্টিকারী দেশ সমুহ ৩টি দলে ভাগ হয়ে বিশ্বব্যাপী তাদের আধুনিকের ছোঁয়া ছড়িয়ে দিতে মনোনিবেশ করলো আরো দ্বিগুণ উৎসাহে। কারণ তারা বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের মতো দেশ সমুহে ফলাফল পেয়েছে আশানুরূপ।  

১। খাদ্য, বস্ত্র,বাসস্থান খাতে আধুনিকায়ন। 

২। নিরাপত্তায় আধুনিকায়ন। 

৩। যোগাযোগের মাধ্যমকে সহজ থেকে সহজতর করাঃ

ক) খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও নিরাপত্তায় আধুনিকায়ন 

খ) সংস্কৃতি বানিজ্যে আধুনিকায়ন। 

আমরা ৩ এর (খ) নং এ দ্রুততার সাথে প্রবেশ করেছি অতি সংক্ষিপ্ত সময়ে এবং অতি সহজলভ্য ভাবে। সেই সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির মালিকগণ তাদের অর্থনীতি দিয়ে অল্প খরচে যে লাভ আদায় করে নিয়েছে, তাদের পরিসংখ্যানে অন্য কোন খাতে অধিক খরচে বিনিয়োগ করেও এতো লাভ পাওয়ার কোন সম্ভাবনাই খুঁজে পায়নি। তার কারণ দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ শুধু দারিদ্র সীমার নিচেই নয়, অশিক্ষিত ও প্রায় রক্ষনশীল বটে।  

ফলে যা হবার তাই হয়েছে, মনের খোরাক কি, কোনটি একজন সুস্থ মানুষের জন্য দরকার, কোন বিষয়টায় রয়েছে সুদুরপ্রসারি নেতিবাচক প্রভাব ইত্যাদি কোন কিছু মূল্যায়ন করার কোন যোগ্যতাই কারো মধ্যে ছিলনা। 

আমরা নিরংকুশ ভাবে ঝুঁকে পড়ি সংক্ষিপ্ত, অস্থায়ী, মন, মনন, মেধা, ধর্ম ধ্বংসকারি বিনোদনের দিকে। যা অতি দ্রুততম সময়ে পরিনত হয় হতাশা থেকে মুক্তি পাবার একটি মাধ্যম হিসাবে। মাদক নেশা আর নগ্ন সংস্কৃতির নেশার মধ্যে কোন পার্থক্যই আর খুঁজে পাওয়া যায়না। বলা বাহুল্য আধুনিকতার সৃষ্টি প্রধানত যাদের হাত হতে এসেছে তারা নগ্ন হতে ও দুর্গন্ধ ছড়াতে শিখেছে আধুনিকতার জন্মের অনেক আগে থেকেই।  

আণবিক বোমা নিক্ষেপ না করেও যে, একটি জাতিকে অথর্ব করে দেয়া যায় তার স্বপক্ষে বেশ ভালই ফলাফল পেয়েছে আধুনিকতার সৃষ্টিকারীরা। আর সেটাইতো চাওয়া। সেখানেইতো বানিজ্য। সেখানেইতো তাদের অর্থনীতির মূল ভিত্তি। যারা আধুনিকতার সৃষ্টি করলো তারা অন্য একটি দেশের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে শুধুমাত্র সংস্কৃতি আগ্রাসন ঘটিয়ে যে বানিজ্য করলো, সেই বানিজ্যে তারা উন্নয়ন ঘটালো ১, ২, ও ৩ এর (ক) সেক্টর। অপরদিকে আক্রান্ত দেশ ততোটাই পিছিয়ে পড়লো উক্ত দিক সমূহে। 

এখন প্রশ্নহলো কে কতো আগে এই স্থানগুলো সনাক্ত করতে পেরে নিজেদের রিকোভার করার পথে এগিয়েছে, আর কে এখনও সেখানেই পড়ে আছে।  

আমরা অভ্যস্ত হয়েছি পরশ্রীকাতরতায় অনেক আগেই। কারণ নিজেদের কোন ক্ষমতাই ছিলোনা।  আর তাই ১,২,৩ এর (ক) বাদ দিয়ে আমরা ৩ এর (খ) তে অধিক পারদর্শী। এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির মালিকগণ এই ব্যবসায় অতি উৎসাহী।  যারফলে আমরা আমাদের সংস্কৃতি হারিয়েছি অনেক আগেই। অর্থাৎ রোগগ্রস্ত হবার পরে যা মৃত। হয়তো এখন কিছু কিছু ফিরে আসার চেষ্টা করছি, হয়তো নিজের মেরুদণ্ড কিছুটা শক্ত করার চেষ্টা করছি। কিন্তু সেটা হবার কোন সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কারণ অভ্যস্ততা আমাদের এখন অধিকার হিসাবে জানি। অন্তত বর্তমান প্রজন্ম তাই জানে, তাদের তাই জানানো হয়েছে। যারফলে অজান্তেই নিজেদের নাচ ভুলেই বসে আছি।  

এখন পরিস্থিতি আরো জটিল, এখন আধুনিকতার সাথে যোগ হয়েছে রাজনৈতিক আধুনিকায়ন, হয়েছে ক্ষমতার আধুনিকায়ন, হয়েছে উন্নয়নের আধুনিকায়ন, হয়েছে আঞ্চলিক ক্ষমতা ভারসাম্যের আধুনিকায়ন ইত্যাদি।  আর তাই আমরা ইচ্ছা করলেও মেরুদন্ড সোজা করতে পারবোনা।  ইচ্ছা করলেই সবকিছু করতে পারবোনা। পেটের মধ্যে নাড়ী, শিরা, উপশিরা, ধমনি যেভাবে একে অন্যের সাথে স্বচ্ছ পাতলা পর্দার বন্ধনে থাকে, আধুনিকতার সকল অধ্যায় এখন তেমনি। যে কোন একদিকে টান দিলেই অন্যদিকের কার্যকারিতা বন্ধ হয়ে যাবে।  

আর তাই আমাদের সংস্কৃতি নিয়ে আর বড় কোন কথা বলার সুযোগ নেই। সুযোগটা নিজেদের দোষে নিজেরাই হারিয়েছি।  তাছাড়া কে হিসাব করে সংস্কৃতির?  দিবস পালন ছাড়া আর কিছুইকি আছে আমাদের হাতে? 

একদিকে দিবস পালন করছি, অন্যদিকে ঘরের মধ্যে হাতে হাতে ঘুরছে বিদেশি অপসংস্কৃতির লালন। বলছি দিবসের কথা, অথচ হাতে তখন অন্যকিছু। তাছাড়া সংস্কৃতি কি পেটের ভাত যোগাবে যে, সেটা নিয়ে মাথা ঘামাবো?  

মজার না কথাগুলো? আসলেই মজার। কারণ হয়তো লেখাটা পড়ে কোন বুদ্ধিজীবী বলবে, "যে জাতির সংস্কৃতি ঠিক নেই, সেই জাতির জন্মই বৃথা"।  এই শোনেন, চাপা অন্য কোথাও মারবেন। এ চাপার ভাত নেই। মিয়াসাহেব কথাটা বলেইতো বসে গিয়েছেন ভালো মদ কোন দেশ থেকে আমদানি করা যায়, নিজের বৌ বাদ দিয়ে পরনারী কতজনকে ভাড়া করা যায়, এডাল্ট মুভি না দেখলে ঘুমই আসেনা, কাপড়চোপড় কোন কোন স্থানে কতটা ফাঁক রাখা যায় সেই সব চিন্তায়। খুঁজে চলেছেন কোন দেশের ডিজাইন সবচেয়ে ভালো, কত ডিজাইনে নগ্ন মাতাল হওয়া যায় ইত্যাদি। 

কথাগুলো লিখতে আমারো খুব খারাপ লেগেছে, বিশ্বাস করুন সত্যি খারাপ লেগেছে।  আমি লিখতে চাইনি। আমি সত্যি চেয়েছি আমার ভাষা, আমার সংস্কৃতি সবার উপরে থাক।  কিন্তু বলেনতো - দুইদিন আগে মিরপুর স্টেডিয়াম আসলেই কি ফাঁকা ছিলো? সেখানে ফাঁকা ছিলোনা।  বরং ব্লাকেও টিকিট পাওয়া যায়নি, পাওয়ার আগেই ফুরিয়ে গেছে। 

আচ্ছা বলেনতো, যারা স্টেডিয়ামে জাননি বা যেতে পারেননি তারা ইউটিউবে ভিডিওটা খুঁজে বেড়াননি? বা টেলিভিশনে সরাসরি দেখায়কিনা খুঁজে দেখেন নি?  সবই করেছেন। যারা করেননি তাদের অধিকাংশই সুযোগের অভাবে সৎ।  তাই বলে এটা নয় যে, সৎ নেই। তাই বলে এটা নয় যে, তার সংখ্যা কম।  কিন্তু তাদেরযে কোন ক্ষমতাই নেই সিস্টেম পরিবর্তন করার। 

ঠিক এখন যেমন একটি সংখ্যার কোন ক্ষমতা নেই সিস্টেম পরিবর্তনের, ঠিক ৯০ দশকের দিকেও ৯০ শতাংশ মানুষের কোন ক্ষমতা ছিলোনা আধুনিকতাকে সিস্টেমের মধ্যে রেখে, দেশের কথা মাথায় রেখে লুফে নেবার। 

আগে সংখ্যা বেশি ছিলো সিস্টেম পরিবর্তনের, কিন্তু ক্ষমতা ছিল না। আজ সেই সংখ্যা তলানিতে তাই সিস্টেম পরিবর্তনের প্রশ্নই ওঠে না।  

তাহলে অংক কোথায় দাঁড়ালো? মৃত বাংলা সংস্কৃতির দাফনের কাজ চলছে তাইতো?  

আগামী ৫০ বছর পরে, হয়তো এতো সময় লাগবে না, তার আগেই বাংলা সংস্কৃতি হয়ে যাবে একটি লঘু সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি। তাও হয়তো সীমাবদ্ধ হবে শুধুমাত্র দিবস পালনের মধ্যেই। আর তাই অবাক হবার কিছুই থাকবে না, যখন আমরা উলঙ্গ হয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াবো। সেখানেই খুঁজে নেব বেঁচে থাকার দুর্গন্ধযুক্ত নির্মল আনন্দ।।