সম্পাদকীয়

মানিব্যাগই সকল ক্ষমতার উৎস?

প্রকাশ: ১১ ডিসেম্বর ২০১৯     আপডেট: ১১ ডিসেম্বর ২০১৯

আবদুল মালেক, উপ-সম্পাদক ■ বাংলাদেশ প্রেস

মানিব্যাগই সকল ক্ষমতার উৎসশুরুতেই এসএ গেমসে সোনা জয়ীদের অভিনন্দন। আর্চারিতে দশে দশ পেয়েছে আমাদের ছেলেমেয়েরা। নিত্যদিনের দুঃসংবাদের মধ্যে এ সংবাদ মনে ফুরফুরে ভাব এনে দিয়েছে। যে কোনো প্রতিযোগিতায় সদিচ্ছা, একাগ্রতা, অনুশীলনেই মিলে সফলতা। হিমালয়ের মতোই মাথা উঁচু করে বিজয় মঞ্চে উঠেছে সোনার ছেলেমেয়েরা, উড়িয়েছে গর্বের লাল-সবুজের পতাকা। এঁরাই একদিন অলিম্পিকের মতো বিশ্ব আসর মাতাবে সেদিন খুব দূরে নয়। শুভকামনা রইলো অবিরাম। 

গল্পের মতো মনে হলেও সত্যি। সবে আড্ডা জমেছে, হঠাৎ  হৈচৈ। ভরা বাজার, কত রকম মানুষ। এগিয়ে দেখি এক পুলিশ এক যুবকের কলার চেপে ধমকে জিজ্ঞেস করল, ঐ মহিলার পিছনে ঘুরঘুর করছিলি কেন? সত্যি কথা বল। যুবকটি বললো, মহিলার পার্সে একলাখ টাকা। সুযোগ পেলেই খালাস দিতাম। শুনে উপস্থিত সবাই তাজ্জব। বুঝলাম, যুবকটি পকেটমার। মনে মনে ভাবলাম, পকেটমারে সয়লাব এখন সমাজ। যুবকটি তবু স্বীকার করেছে, অন্যরা করেনা। ভদ্রতার মুখোশ এঁটে থাকে। আসলে সবারই লক্ষ পার্স, মানি, মানিব্যাগের দখল নেওয়া। 

টাকায় সব করা যায়। টাকা নাই, কিছুই নাই। ক্ষমতা, আধিপত্য, দখল, টেন্ডার, সেবা সব স্ফীত মানিব্যাগের খাঁজে-ভাঁজে বন্দী। বনেদিআনা, বংশ মর্যাদা, ঐতিহ্য কিছু না। টাকায় মিলে প্রথম সারির আসন। যোগ্যতার প্রয়োজন নাই, টাকা থাকলেই স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসার, বাজার হাটের সভাপতির পদ। মিলে পয়লা সারির আসন, একদম ইমাম সাবের পরেরটিই, হোক ঘুষের ডাকাতির, পকেটমারের, ছিনতাইয়ের। টাকার গায়ে উৎস লেখা থাকে না কিন্তু মর্যাদা বাড়িয়ে দিতে টাকার বিকল্প নাই।

সত্যিই টাকার বিকল্প নাই। একটি রুটি, একফোঁটা দুধ, এক লোকমা ভাত বিনা টাকায় মিলবে না। সন্তানের শিক্ষা, মাথা গুজার ঠাই, রোগের চিকিৎসা সবকিছুর জন্য টাকা চাই। প্রতিটি মানুষের জন্য এই টাকা বরাদ্দ আছে। যোগ্যাতার ভিত্তিতে এই টাকা আসতে পারে। কিন্তু অসহিষ্ণু মানুষ এতো ধৈর্য্য ধরতে রাজি নয়। দ্রুত চাই, প্রচুর পরিমাণে চাই। এজন্য যা করা প্রয়োজন করতে রাজি। লোভী মানুষ সব সুখ টাকার বিনিময়ে অর্জন করতে চায়। টাকায় ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়। সমৃদ্ধ ও সুখের আগামী কিনে নিতে চায়। 

চেয়ারম্যান মাও সেতুং বলেছিলেন বন্দুকের নলই  ক্ষমতার উৎস। গণতান্ত্রিক নেতারা বলেন জনগনই ক্ষমতার উৎস। মেজর জিয়া ভাবতেন টাকাই ক্ষমতার উৎস। এখন মেজর জিয়ার তত্ত্বই আমরা মেনে চলছি। তিনি বলতেন, টাকা থাকলে সব সম্ভব। কেউ একজন প্রশ্ন করেছিলেন, সে টাকা আসবে কোত্থেকে? তিনি বলতেন, টাকা দেবে গৌড় সেন। গৌড় সেনের ঠিকানা তিনি জানতেন। রাষ্ট্রীয় কোষাগার ব্যবহার করে তিনি ক্ষমতা পাকাপোক্ত করেছিলেন তবে শেষ রক্ষা হয়নি। ব্যাপার এই যে, অনৈতিক পন্থা স্থায়ীত্ব পায়না। 

ক'দিন আগে চাচাতো বোন যাবে মার্কেটে। বললো, চল। আমি প্রমাদ গুনলাম। কারণ মেয়েরা শাড়ীর দোকানে ঢুকলে বেরুতে চায় না। হলো তা-ই। অনেক ঘুরাঘুরি। বিরক্ত হয়ে বললাম, পছন্দ হচ্ছে  না? বললো, "পছন্দ তো সবগুলোই"। বললাম, "তবে কিনে ফেল"। বললো, অত টাকা পাবো কই? বললাম, যে কয়টার টাকা আছে তা-ই কেনো! বললো, "কোনটা বাদ দিব বল"! বোঝো এবার!  দুষ্টুমি করে বললাম, "আচ্ছা, এতো পাত্র থেকে দুলাভাইকে কি করে পছন্দ করেছিলে? তখনও কি সবাইকেই পছন্দ হয়েছিল। একটুও না ভেবে বললো, "তুই ঠিকই বলেছিস, সবাইকেই আমার পছন্দ ছিল"। 

আমি অবাক হলাম। এমনও হয় নাকি! এ যেন টাকার উৎসের মতো। সবই আমার চাই। সবকিছুর দখল চাই। সবাইকে বশে রাখতে চাই। বশে রাখতে, আয়ত্তে রাখতে একমাত্র সালশা হলো টাকা। একটি স্ফীত মানিব্যাগ। এটি দিয়ে সকল অসম্ভব নিমেষে সম্ভব করা যায়। যার মানিব্যাগ কড়কড়ে নোটে ঠাসা তার পায়ে বিনাবাক্যে নিজেকে সমর্পন করে মানুষ। তার গোলামী করতেও প্রস্তুত। আর কিছু চাইনা। বিবেক-বিবেচনা, মান-মর্যাদা, আত্মসম্মান ভেসে যাক শীতলক্ষ্যার জলে। প্রকৃতপক্ষে সকল ক্ষমতার উৎস ঐ মানিব্যাগই।