সম্পাদকীয়

রঙিন ছাত্র রাজনীতি: এরাই নাকি আগামীর নেতা!

প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯

আবদুল মালেক, উপ-সম্পাদক ■ বাংলাদেশ প্রেস

প্রেসিডেন্ট এরশাদকে যত দোষই দিই ঊনত্রিশ বছর আগে তাঁর আমলেই হয়েছিল সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচন। এরপর বেগম জিয়ার তিনদফা, শেখ হাসিনার দু'দফায় আর হয়নি। অবশেষে শেখ হাসিনার চলতি মেয়াদে খুললো ডাকসুর রুদ্ধদ্বার। অনেকের ধারণা ছিল রাষ্ট্রের গণতন্ত্র যা-ই হোক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বোধহয় গণতন্ত্র এলো! কিন্তু দিনদিন ছাত্র রাজনীতি সর্বনাশের শেষ ধাপে পৌঁছে গেছে। রাজনীতি মানেই যেন দলীয় পদ-পদবী ব্যবহার করে টাকা রোজগার করা! ভয়ানক ব্যাধিতে আক্রান্ত বিবেক, নীতি-নৈতিকতা, মূল্যবোধ। 

টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার কারণে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাদের মধ্যে জমিদারি ভাব চলে এসেছে। শুদ্ধি অভিযান চলার সময় একের পরে ধরা পড়ে যুবলীগ নেতারা। ক'মাস আগে ছাত্রলীগ সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক বহিষ্কার করা হয় দুর্নীতির দায়ে। অভিযোগ আসে একাধিক এমপির নামেও। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান কোন পর্যায়ে আছে তা জানেন কেবলমাত্র শেখ হাসিনা। তবে নিঃসন্দেহে বলা যায়, জনগন প্রধানমন্ত্রীর পদক্ষেপে স্বস্তি পেয়েছিল। কিন্তু দুর্নীতিবাজরা যে বসে নেই এর প্রমাণ দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতি। আমার অলোচ্য বিষয় দ্রব্যমূল্য নয়।

আলোচ্য বিষয়, বর্ণময় রঙিন ছাত্র রাজনীতি। রঙিনই বটে, যেমন রঙিন বিপিএল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। টিভির সামনে বসেছিলাম ভিপি নুরু ও জিএস রাব্বানীর পরস্পর কাঁদা ছুঁড়াছুঁড়ি শুনতে। হলোনা। ততক্ষনে বম্বে থেকে উড়ে আসা সালমান, ক্যাটেরিনা, কৈলাশ খের ও সোনু নিগ্যম দখল করেছে টিভি স্ক্রিন। পারফরম্যান্স মানসম্মত না হলেও দেখেছি। সোনু নিগ্যমের ভরাট  কণ্ঠে, "সুরুজ হুয়া মধ্যম চাঁদ জ্বলনে লাগা, আসমায়ে হায় কিউবি খালনে লাগা, ম্যে ঠেহ রা রাহা জমি চলনে লাগি, ধরকায়ে দিল শ্বাস থামনে লাগি, কেয়া এ মেরা পেহলা পেহলা পেয়ার হে, স্বজনী, শুনলাম। ভালো লেগেছে। অনেকদিন পর উদাস অতীতে ফিরিয়ে নিতে পেরেছে সোনু নিগ্যম।

৭১' টিভিকে ধন্যবাদ। মধ্যরাতের আয়োজনে ডাকা হলো নুরু-রাব্বানীকে। দু'জনই অভিযুক্ত। রাব্বানী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় উন্নয়ন কাজের বখরা চেয়ে বহিষ্কৃত, নুরু অভিযুক্ত ১৩ কোটি টাকা সম্পর্কিত ফোনালাপের ফাঁসের দায়ে। রাব্বানী সেই ফোনালাপের সূত্র ধরে ভিপি নুরুর পদত্যাগ দাবী করছে। পক্ষান্তরে নুরুর জবাব, কেউ যদি প্রমাণ করতে পারে ভিপি পদ ব্যবহার করে আমি অনৈতিক পন্থায় টাকা কামানোর চেষ্টা করেছি তবে স্বেচ্ছায় ভিপি পদ ছেড়ে দিব। অর্থাৎ আমাদের ছাত্র রাজনীতির চেহারা কি দাঁড়ালো? এঁরাই তো আমাদের ভবিষ্যৎ নেতা! কাদের হাতে রেখে যাচ্ছি আগামী প্রজন্ম? 

ছাত্র রাজনীতিকে রঙিন জগতের সন্ধান দিয়েছে কিছু লোভী নেতা। আধিপত্য বজায় রাখতে ছাত্রদের ব্যবহার করছে লাঠিয়াল হিসাবে। ছাত্রারাও নিজেদের বিকিয়ে দিচ্ছে নেতা ও টাকার কাছে। এক্ষেত্রে পরিবারগুলোও কম দায়ী নয়। পড়াশোনার নামে অবাধ স্বাধীনতা পায় ছাত্রছাত্রীরা। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলে তো কথাই নেই। রাজনৈতিক দলে নাম লেখালেই কেল্লাফতে।  ছাত্র নেতাদের চলাচল করে  মার্সিডিজ, হেলিকপ্টার, প্লেনে। কাউকে মানে না এরা। না মা-বাবা, না শিক্ষক। তৈরি হয় একেকটা দানব। ভোগবাদী দুনিয়া প্রতিনিয়ত এদের ডাকে। 

সব মা-বাবা সন্তানকে আদর-স্নেহে মানুষ করতে চায়। অতীত-বর্তমানের পার্থক্য এই, অতীতে সন্তান নিয়ে এত আদিখ্যেতা ছিলনা। এখন আদিখ্যেতা করতে গিয়ে  সর্বনাশ ডেকে এনেছি। এরা বেপরোয়া। রাজনীতির নামে ছেলে গুন্ডামী করে, মেয়ে স্বাধীনতার নামে ব্যাগ গুছিয়ে বয়ফ্রেন্ডের বাড়ি চলে যায়। এরাই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম! এরাই বিভিন্ন দলের সদস্য। বাবা-মা জানেনা সন্তান কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে। সন্তানও জানেনা বাবা-মা'র প্রকৃত আয়ের উৎস। অতএব, দুইয়ে দুইয়ে চার। ফলে রাজনীতির রঙিন দুনিয়ায় প্রতিদিন নতুন সদস্যের আগমন ঘটছে।  সচেতন না হলে এই সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়বে।