সম্পাদকীয়

শেখ হাসিনাকে একা করে দেবার প্রক্রিয়া কি ক্রমেই প্রবল??

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০১৯

মোঃ তৈমুর মল্লিক ভূঁইয়া, উপ-সম্পাদক ■ বাংলাদেশ প্রেস

শুরু থেকে একটা ভয়, একটা শঙ্কা যেন চেপে ধরেছিলো, সেটা ক্রমেই আরো বৃদ্ধি পেয়ে সুনামির দিকে যাত্রা করেছে সেটা বলার অপেক্ষা রাখেনা। 

শুরু থেকেই আমরা দুর্নীতিবাজ সেটা নিয়ে কোন দ্বিমত নেই। বঙ্গবন্ধু সেটা উচ্চ স্বরেই বলে গেছেন। সময়ের সাথে সাথে সেই দুর্নীতি আধুনিকতার সাথে হয়েছে আধুনিকায়ন। যার শেকড় এখন অনেক গভীরে।  

বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানা ৩য় বারের মতো ক্ষনতায় আসার আগে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন এই লাইনটি লিখেছিলেন।  

যেহেতু এর পূর্বে সব সরকারের আমলেই এমন বক্তব্য পূর্ণতা পায়নি বা এমন বিষয় আদেও সফল করা সম্ভব নয় মনে করে বিষয়টি কেউ আমলেই নেয়নি।  সেহেতু এবারও শেখ হাসিনার এমন ইশতেহার ঘোষিত বাক্যকে থোড়াই কেয়ার করে নিজেদের কাজ চালিয়ে গেছে সকলেই।

সবই ঠিকঠাক চলছিলো, শেখ হাসিনার বিরোধীপক্ষ তাদের বিরোধী নীতি নিয়ে চলছিলো, শেখ হাসিনা দেশ ভরা দুর্নীতিবাজ নিয়ে যাদের প্রায় সকলের পরিচয় আওয়ামিলীগ  নিয়ে যার যার কারবার চালিয়ে যাচ্ছিলো।  অন্যদিকে অর্থনীতির চাকা সচল রেখে শেখ হাসিনা নিজের অবস্থানেই ছিলো। অন্যদিকে সাধারণ মানুষ দুর্নীতির চাকায় পিষ্ট হয়ে একরকম অভ্যস্ত হয়ে মরতে মরতে বেঁচে ছিলো। 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন বিদেশ থেকে সাফল্যের পদক নিয়ে  দেশে ফিরেছে, বিমানবন্দর হতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অবধি নেতা কর্মির বিজয় মিছিল ছিলো, আবার ইউনিয়ন চেয়ারম্যান নির্বাচনে হাজার মানুষের মটর সাইকেল শোভাযাত্রা ছিলো, টি এস সি মোড় হতে শাহাবাগ পর্যন্ত অতি সামান্য কারণে ছাত্র ছাত্রীদের সমাবেশে অচল হয়ে পড়েছে সমগ্র রাজধানী ইত্যাদি ইত্যাদি। 

আচমকাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অচেনা হয়ে গেলেন। তিনি অচেনা হবার আগে বার্তা দিয়েছিলেন। কিন্তু যা হয় আরকি, পূর্বের কোন ইতিহাস না থাকার দরুন কেউ সেই বার্তার মর্মকথা বুঝতে পারলেন না। এরপর ছাত্রলীগের নেতা দিয়ে শুরু হলো শেখ হাসিনার অচেনা আত্মপ্রকাশ। তিনি দুর্নীতি বিরোধী অভিযান চালাবেন এটা আন্দাজ কেউ কেউ করতে পারলেও নিজের ঘরেই প্রথম আঘাত হেনে নিজের দলের মধ্যেই রুদ্রমূর্তি ধারণ করবেন সেটা অনেকেই বুঝতে পারেনি। সারা দেশ চমকে উঠলো, এমনকি বিরোধী শিবির চমকে উঠলো। বিরোধী দল তখনও বেশ নত অবস্থায় থেকেছে, কেউ কেউ শেখ হাসিনার প্রশংসাও করেছে। কিন্তু ক্যাসিনো নামক জুয়া, মদ, আর অবৈধ কর্মকাণ্ডে হাত দিতেই সারা দেশ হৈ হৈ শুরু করলো। গ্রাম শহর সোশ্যাল মিডিয়া চারদিকে শেখ হাসিনা আর শেখ হাসিনা। বিশ্ব মিডিয়া শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তার রেটিং বৃদ্ধি পেয়েছে বলে প্রচারও করলো। 

তখনও বিরোধী পক্ষ এবং তার নিজ দল অনেকের মধ্যে বিশ্বাস ছিলো, শেখ হাসিনা দলের স্বার্থে নতজানু নীতি গ্রহণ করবেন। কিন্তু এরমধ্যেই যখন ঘোষিত হলো শেখ হাসিনার পরিবার বলতে কাদের বোঝায় তখন থমকে গেলো তার দল, কারো মুখেই যেন কোন কথা নেই। 

বিরোধী পক্ষ প্রমাণ করে দিয়েছে তারা রাজনীতি করে দেশের জন্য নয়, ক্ষমতার জন্য। আর তাই সকল অনৈতিক বিষয়ের জন্মদাতা দুর্নীতিকে আঘাত শুরু করার পরও তারা খুশি হতে পারেনি। অভিযানের আগে খুশি হতে পারেনি দুর্নীতি আছে বলে, অভিযানের পরে খুশি হতে পারেনি নিজেরাই জালে আঁটকা পড়তে চলেছে বলে। অলরেডি লণ্ডনে দেখা দিয়েছে অর্থের সংকট।  

বিরোধী দল তাদের কাজ করবে তাতে অবাক হবার কিছু নেই। কিন্তু আওয়ামিলীগ?  

শেখ হাসিনা বলতে যে দলটি পাগল, সামান্য কারনে মিছিল আর মিছিল। সমাবেশ আর সমাবেশ। কোথায় তাদের সেই উম্মাদনা, কোথায় তাদের সেই আবেগ, কোথায় সেই ভালোবাসা? 

শেখ হাসিনার হয়তো বিশ্বাস ছিলো, দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে আঘাত হানার সাথে সাথে সারা দেশের মানুষ রাস্তায় নেমে আসবে, নেত্রীর পাশে দাঁড়াবে, উত্তাল করে ফেলবে সমগ্র দেশ এই অভিযানের পক্ষে সমর্থন জানিয়ে। কিন্তু কোথায় সেই সব?  সব থমকে গেছে। একজন অন্যজনের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রয়েছে। নেই সেই নেতারা যারা শেখ হাসিনার বদৌলতে এতোদিন ক্ষমতায় রয়েছে, নেই সেই ভালোবাসা, যে ভালোবাসা সামান্য কারনে অচল করে দিতো সমগ্র রাজধানী, এমনকি সারা দেশ। 

বুঝতে বাকি থাকার কথা নয়, একটি স্নায়ু যুদ্ধে সামিল হয়েছে সকল নেতা কর্মি। 

দীর্ঘদিন ধরে সারা দেশে আওয়ামিলীগের ত্যাগী নেতা কর্মিদের কান্না দেখতে পাওয়া গেছে, তারা চিৎকার করে বলেছে - আজ আর তাদের কান্না ছাড়া কিছুই নেই। দলের মধ্যে গণহারে প্রবেশ করেছে বহিরাগত। যারা রাজাকার ছিলো, স্বাধীনতা বিরোধী ছিলো, বঙ্গবন্ধুর খুনির বংশধর ছিলো তাদের গণহারে আওয়ামিলীগ হতে দেখে কাঁদতে কাঁদতে আস্তে করে চলে গেছে পিছনের কাতারে। 

যারা প্রবেশ করিয়েছে তারা অতি সুকৌশলে মোটামুটি একটি সুখের স্বর্গে সময় কাটালেও আজ যখন মরণ সামনে এসে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছে তখন বাঁচার একটাই রাস্তা তাদের কাছে, "সেটা হলো, শেখ হাসিনাকে একা করে দেয়া"। শেখ হাসিনার বিশ্বাসের জায়গাগুলো অবিশ্বাসী করে দেয়া, আস্থার স্থানগুলো নষ্ট করে দেয়া। আর সেই জন্যেই স্নায়ু যুদ্ধে অংশ নেয়া ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই।  

অপর দিকে পিছনে চলে যাওয়া ত্যাগী আওয়ামিলীগ সামনে আসার জন যে স্পেস দরকার সেটাও এখনও পেয়ে ওঠেনি।  কিন্তু শুধু স্নায়ু যুদ্ধ করে শেখ হাসিনাকে দুর্বল করা যাবে না সেটা মোটামুটি সকলের জানা। আর তাই এই মুহুর্তে মনে হচ্ছে তারা সশস্ত্র যুদ্ধে মাঠে নামতেই তৈরি হতে চলেছে।  নিশ্চিত ভাবে সেই যুদ্ধে শেখ হাসিনার বিপক্ষে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করতে চেষ্টা চলছে ছাত্রলীগ ও যুবলীগকে।  কারন যুদ্ধ করতে চাই তরুণ রক্ত, তাজা রক্ত। 

ছাত্রলীগ ও যুবলীগ এই দুইটি সংগঠন সহ আওয়ামিলীগ দুর্নীতি বিরোধী অভিযান শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত সম্মিলিত ভাবে শেখ হাসিনার পাশে দাঁড়ায়নি, একটা কর্মসূচি দিয়ে তারা সমগ্র দেশকে জাগিয়ে দেয়নি শেখ হাসিনার পাশে দাঁড়াতে। তারা কেউ মাঠে নেমে, রাস্তায় নেমে দুর্নীতি বিরোধী অভিযানকে স্বাগত জানায়নি। সমগ্র দেশে ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়ে বলেনি," প্রধানমন্ত্রী, আপনি এগিয়ে চলুন। আমাদের ভিতরে যদি কোন আগাছা থাকে, আসুন আমাদের সেই আগাছা পরিস্কারে সাহায্য করুন, আসুন যারা আমাদের মধ্যে বসে থেকে দুর্নীতি করছে তাদের বের করে দিন "। অথচ উচিত ছিলো তাদের সেটাই করা। দায়িত্ব ছিলো সেটাই করা। কিন্তু সেটা যখন তারা করেনি, তারা প্রমাণ করেছে, প্রায় সকলেই তারা দুর্বল, ভীত ও অকৃতজ্ঞ। সেই সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছে কিছু নেতাগন। শেখ হাসিনার পাশ থেকে তারা সরে গেছে, স্নায়ু যুদ্ধের স্থানে সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত হতে মাঠে নেমে গেছে।  তাদের চাই এখন মোক্ষম স্থানে কিছু লাশ।  

এরশাদ বিরোধী আন্দোলন যখন কিছুতেই জমে উঠতে পারছিলো না, তখন কৌশলগত ভাবে মানুষের আবেগ নাড়া দিতে এরশাদ বিরোধি দলে দরকার ছিলো লাশ। তারা সেই লাশ পেয়েও গেলো। বাঙালির আবেগের উত্তাল স্রোতে ভেষে গেলো এরশাদ।  

আজ যখন শেখ হাসিনা অচেনা, আজ যখন শেখ হাসিনা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এবং আপোষহীন তখন শেখ হাসিনা বিরোধী শিবিরেও দরকার সেই লাশ। বাঙালির আবেগকে পুঁজি করতে চাই লাশ।  

এটা ভাবার কারন নেই শুধুমাত্র দলীয় ভাবে বিরোধী পক্ষ লাশ চায়, এর সাথে যুক্ত এখন নিজের দলের বিদ্রোহী হয়ে ওঠা পক্ষ।  স্বীকার না করলেও এটাই সত্যি মানুষ আত্মপক্ষ সমর্থন করে বাঁচার জন্য শেষ চেষ্টা করবেই। আর তাই শেখ হাসিনা এখন দলীয় ভাবে বিরোধী পক্ষের সাথে যুদ্ধ করবে না, একি সাথে যুদ্ধ করতে হবে আরো অধিক ভয়ঙ্কর নিজের দলের অঘোষিত বিদ্রোহী পক্ষের।  দলীয় ভাবে বিরোধী পক্ষের কাজ সেখানে শুধু বাতাস দিয়ে যাওয়া। 

তাই শেখ হাসিনার বিরোধী শক্তির দরকার এখন লাশ।  

আবরারকে হত্যা করা হলো। ১৯ জনের নামে মামলা হয়েছে। যারা যে যেখান থেকেই আসুকনা কেন, এখন সবাই ছাত্রলীগ।  একটু লক্ষ করে দেখুন - একজন মানুষকে অতি ঠান্ডামাথায় অনেকগুলো মানুষ পিটিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছে। কোথাও ফাঁটেনি, কেটে যায়নি, ছিড়ে যায়নি। প্রফেশনাল ভাবে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ইন্টারনাল ব্লেডিং হয়ে সে মারা গেছে। ভারতের বিরুদ্ধে কি বলেছে সেটাকে ইস্যু করে তাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে হত্যাকাণ্ড সমাপ্ত হলো। তাকে রাস্তায় মারেনি, নদীর পাড়ে মারেনি, ক্যাম্পাসে বসেই মেরেছে। মারার পরে তাকে বহন করে নিয়ে যাবার ভঙিমা, তার সামনে পিছনে হেটে আসা ছাত্রদের নিশ্চিন্ত মানুষিকতা কিসের ইঙ্গিত দেয় ভাবুন।  শিক্ষাঙ্গন কেন বেছে নিলো এই হত্যা যজ্ঞে? আর সেটা বুয়েট কেন? যুদ্ধের কৌশল অনুসারে বুয়েট ছিলো নিরাপদ।  একটি লাশের দরকারছিলো সেটা তারা পেয়ে গেছে। যার ফলে একদিন আগে শেখ হাসিনার অবস্থান আর একদিন পরে শেখ হাসিনার অবস্থান এই দুইয়ের পার্থক্য, সরূপ পরিষ্কার নির্দেশ করে তারা যা চেয়েছিলো প্রথমদিনে সেটাতে তারা সফল। 

বিদ্রোহী গোষ্ঠী শেখ হাসিনাকে এই লাশের বিনিময়ে একটি বার্তা দিতে চেয়েছে। সেটা নাইবা উল্লেখ করলাম। শেখ হাসিনার উপর এটি শক্ত একটি মানুষিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা। 

যে ছাত্রলীগের উচিত ছিলো দুর্নীতি বিরোধি অভিযানে শেখ হাসিনার পাশে দাঁড়ানো, সেখানে তারাই একটি লাশের বিনিময়ে দুর্নীতি বিরোধি অভিযানকে বাঁধাগ্রস্ত করলো?  এটি শেখ হাসিনার উপর মানুষিক চাপ সৃষ্টি এবং নিশ্চিত ভাবে নিজ দলের বিদ্রোহী চেহারা সামনে নিয়ে আসা। এসবই শেখ হাসিনাকে একা করে দেওয়ার ষঢ়যন্ত্রকে নির্দেশ করে। 

একটি সুক্ষ কারসাজির মাধ্যমে দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে দেশের ছাত্র, কামলা, আমলা সর্বসাধারণ যেন কোন ভাবেই দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে সরাসরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পাশে না দাঁড়াতে পারে তার জন্য এই একটা লাশ নয়, হয়তো আরো লাশের মুখ দেখতে হতে পারে। প্রধানমন্ত্রীকে যে ভাবেই হোক একা করে দেবার ষঢ়যন্ত্র অত্যন্ত শক্তিশালী চেহারা নিয়ে সামনে আসছে।  

আমাদের অবশ্যই মনে রাখা দরকার, একবার যদি শেখ হাসিনা হেরে যায় তাহলে বাংলাদেশের চিত্র অন্যভাবে অঙ্কিত হবে।  

ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামিলীগ সমগ্র দেশের উচিত প্রধানমন্ত্রীর পাশে সক্রিয় ভাবে দাঁড়ানো। রাস্তায় নেমে এসে দুর্নীতির বিরুদ্ধে মাঠ প্রকম্পিত করা। আর কোন লাশ নয় সেই নীতিতে পথচলা। এই মুহুর্তে একটি লাশ স্নায়ু যুদ্ধকে রূপ দিতে পারে সশস্ত্র যুদ্ধে। ব্যাহত হতে পারে দুর্নীতি বিরোধী অভিযান। কিছুতেই শেখ হাসিনাকে একা হতে দেয়া যাবে না। একবার একটু ভাবুনতো, শেখ হাসিনা কেন একা দায় কাঁধে নেবে?  আমাদের কি কোন দায় নেই???