সম্পাদকীয়

কেন ছাত্রলীগের এই বাম জবাই করার আকাঙ্ক্ষা?

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৯     আপডেট: ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ইমতিয়াজ মাহমুদ

ছাত্রলীগ নাকি একটা একটা বাম ধরে ধরে সকাল বিকাল জবাই করার ইচ্ছা প্রকাশ করে শ্লোগান দিচ্ছে। এতে তো বিস্ময়ের কিছু নাই। আপনি অবাক হয়েছেন? আপনি অবাক হয়ে থাকলে আপনি বোকাদের দলেই আছেন।

আর এই পোড়ার দেশে এইরকম বোকাদের সংখ্যা কিন্তু নেহায়েত কম না। বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষকে আমি চিনি যারা কোন না কোনো সময় কোন না কোন বামপন্থী বা প্রায় বামপন্থী সংগঠনের সাথে ছিল, এখনো সেইভাবে আওয়ামী লীগ করে না, কিন্তু আওয়ামী লীগের প্রতি একধরনের সহানুভূতি বোধ করে। শুধু সহানুভূতি না, আওয়ামী লীগের উপর নির্ভরও করতে চায়। এরা মনে করে যে আওয়ামী লীগই এই দেশের সেক্যুলার ও লিবারেল ধারার ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একমাত্র ধারক ও বাহক, আর আওয়ামী লীগের সমালোচনা করলে দেশের সর্বনাশ হয়ে যাবে। এরা আওয়ামী লীগের দল করে না কিন্তু নিষ্ঠার সাথে গিয়ে নৌকা মার্কায় ভোট দেয়। আওয়ামী লীগের কোন কমিটি মেম্বারও হয়তো কোথাও নৌকায় ভোট নাও দিতে পারে কোন্দল বা এরকম কোন কারণে, কিন্তু এই বেকুব ভাইজানেরা কোন অবস্থাতেই নৌকা ছাড়া আর কোথাও ভোট দিবে না।

আর একদল সাবেক বাম তো আওয়ামী লীগে যোগই দিয়েছে। এরা বোকা নয়, এরা চালাক স্বার্থপর এবং চোরা প্রকৃতির নজর ছোট। (কিছু ব্যতিক্রম হয়তো আছে, আমি দেখিনাই।) নজর ছোট মানে? মানে মানে এদের বেশীরভাগই ছোট ছোট চুরি করে আরকি, বড় চুরি করার কলজে নাই। দুইএকজন অবশ্য বড় চোরও হয়েছে, তবে ঐ দুই একজনই। আমি সাবেক ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী যারা আওয়ামী লীগে গেছে ওদের কথা বলতে পারি, নৈতিক অসততার মান ধরলে এরা ছাত্রলীগ থেকে আসা আওয়ামী লিগারদের চেয়ে একটু বেশী অসৎ, কিন্তু অসততা করে প্রাপ্তিযোগ যেটা হয় সেই দিক দিয়ে এরা ফকির- সামান্য ক্ষুদ কুড়ার জন্যেই ঈমান বিক্রি করে বসে থাকে।

ছাত্রলীগের বাম জবাই করার আকাঙ্ক্ষার কথা বলছিলাম। কেন ওরা এইপ্রকার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করছে আর কেন এটাতে বিস্মিত হবার কিছু নাই সেই কথাটা বলি। আমার কথাগুলি প্রথম ক্যাটাগরির নৌকার ভোটারদের উদ্দেশ্যে। সেকেন্ড ক্যাটাগরির বুদ্ধিমান বন্ধুদের উদ্দেশ্যে এই পোস্ট নয়।

(২)

কেন ছাত্রলীগের এই বাম জবাই করার আকাঙ্ক্ষা? আর এই বাম কোন বাম? এই আকাঙ্ক্ষাটি কি একটি বিশেষ ক্যাম্পাসের প্রবণতা মাত্র? নাকি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় ও জাতীয় নীতিমালারই প্রতিফলন এই বাম-নিধন আকাঙ্ক্ষা? এই সব প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করি চলেন। আগে দেখে নিই আজকে এই দুই হাজার উনিশ সনে ছাত্রলীগের নীতি ও আদর্শ বলে কিছু আছে কিনা আর থাকলে সেটা কি।

গত কোরবানির ঈদের ছুটিতে ঢাকার বাইরে ছিলাম, সেখানে বসে বসে দেখি ছাত্রলীগের একটা পোস্টার বেশ চাউর হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জুড়ে। সেটা ছিল ১৫ই আগস্ট উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কর্মসূচী ছিল সেটা। আপনাদের মনে আছে সেই পোস্টারটির কথা। সেই পোস্টারটিই বর্তমান ছাত্রলীগের মৌলিক রাজনৈতিক ও আদর্শগত অবস্থান নির্দেশ করে। মানে কি? মানে হচ্ছে, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের এখনকার আদর্শগত অবস্থান হচ্ছে মুসলিম জাতীয়তাবাদ বা মুসলিম বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। শুনতে বিচ্ছিরী লাগতে পারে, কিন্তু ছাত্রলীগ এখন একটি ইসলামপন্থী ছাত্র সংগঠন- এরা ইসলামী ছাত্র শিবিরের মতো রেডিক্যাল নয় বা ফান্ডামেন্টালিস্ট নয়, কিন্তু ইসলামপন্থী এবং ছাত্রদলের চেয়ে একটু বেশী ইসলামপন্থী। বঙ্গবন্ধু যে সেক্যুলার বাঙালী জাতীয়তাবাদের কথা বলে এই জাতিটি প্রতিষ্ঠা করেছেন, সেই সেক্যুলার ধারনা এরা আর ধারণ করে না।

সুতরাং আপনি বুঝতেই পারছেন ছাত্রলীগের নীতি ও আদর্শ আছে, অবশ্যই আছে, তবে সেটা সেক্যুলারিজম নয় এবং বাঙালী জাতীয়তাবাদও নয়। সমাজতন্ত্র বা শোষণ মুক্তি বলে একটা কথাও আগে ছাত্রলীগ বলতো, সেটা তো আওয়ামী লীগ অফিশিয়ালিই ত্যাগ করেছে, ছাত্রলীগ আর সেটা বলবে কেন। বলতে পারেন যে কেবল একটা পোস্টার থেকে একটি সংগঠনের আদর্শিক অবস্থান পরিবর্তন ইত্যাদি বুঝা যায়? না, পোস্টাটাকে আমি কেবল উদাহরণ হিসাবে দেখাচ্ছি- ছাত্রলীগের আদর্শগত অবস্থান ওদের কাজ ও কথা থেকেই বুঝতে পারবেন- পোস্টার তো প্রকাশের একটা মাধ্যম আরকি।

ছাত্রলীগের আরেকটা ব্যাপার আছে- আদর্শ বা নীতি নয় এটা, ক্যারেক্টার বলতে পারেন। সেটা হচ্ছে এরা মারামারি ও দাঙ্গা হাঙ্গামায় বেশ পটু এবং এদের নেতা কর্মীদের একটা অংশ গুণ্ডামি করা মানুষকে ভয় দেখানো এইসব করে। এই ক্যারেক্টারটা আগেও ছিল এখনো আছে। অন্যান্য ছাত্রদেরকে মারধোর করা মাত্রা হয়তো এখন একটু বেড়েছে আর যুগের সাথে ধরণটাও একটু পাল্টেছে। আর এখন গুণ্ডামির সাথে দুর্নীতি যুক্ত হয়েছে। দীর্ঘদিন দল সরকারে থাকার ফলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের পক্ষে নানান কায়দায় টাকা আয় করা এখন সহজ। ফলে ছাত্রলীগের নেতারা এখন অনেক বিত্তবান, কেন্দ্রীয় নেতারা বড় বড় গাড়ী হাঁকায়, চমৎকার বাড়ীতে বাস করে।

এই হচ্ছে ছাত্রলীগের আদর্শগত অবস্থান এবং সাধারণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।

(৩)

এই যদি হয় ছাত্রলীগের আদর্শগত অবস্থান ও সাধারণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তাইলে ছাত্রলীগের ঝগড়া হবে কার সাথে? ছাত্রদলের সাথে ঝগড়া হতে পারে, কিন্তু সেটা হবে ক্যাম্পাসে হল দখল সিট দখল টাকা পয়সার ইয়ে না আবার বেহাত হয়ে যায় এইসব নিয়ে। আদর্শগত কোন দ্বন্দ্ব ছাত্রদলের সাথে ছাত্রলীগের আর নেই। ওদের দ্বন্দ্বটা হচ্ছে অনেকটা দুইটা গ্যাংএর মধ্যে ঝগড়ার মতো। ওদের আদর্শিক ঝগড়াটা এখন তাইলে থাকে শুধু বামদের সাথে। বামদেরকেই জবাই করা বা হত্যা করা এখন ওদের জন্যে জরুরী হয়ে পড়েছে। এই জবাই, ঠিক আছে ধরে নিলাম রূপক অর্থে বলা, মানে হচ্ছে আদর্শগতভাবে হত্যা করা। মানে হচ্ছে বাম আদর্শকে নির্মূল করা।

কোন আদর্শকে নির্মূল করতে চাইছে ছাত্রলীগ? প্রগতিশীলতাকে হত্যা করতে চাইছে ওরা। মানে সমাজ পরিবর্তনের আদর্শকে। আর কোনটা? সেক্যুলারিজম বা ইহজাগতিকতা এবং ধর্মনিরপেক্ষতাকে হত্যা করতে চাইছে। কেন? প্রগতিশীলতা বা সমাজ বদলের আদর্শ আর ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাদি নির্মূল করাটা ওদের জন্যে জরুরী হয়ে গেল কেন? আপনিই বলেন। আপনার কি মনে হয়? ঐ যে উপরে প্রশ্নগুলি করেছিলাম সেগুলির উত্তর দেখেন তাইলে।

ছাত্রলীগ বামদেরকে জবাই করতে চাইছে তার কারণ হচ্ছে ছাত্রলীগ সেক্যুলার সমাজ গড়ার বিপক্ষে। ওরা ইসলামী রাষ্ট্র চায়। বঙ্গবন্ধু সেক্যুলার রাষ্ট্র চেয়েছিলেন, কেননা বাঙালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিই হচ্ছে সেকুলারিজম। ওরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ত্যাগ করেছে। শুধু তাই না, বঙ্গবন্ধুকেও আজকাল ওরা মুসলমানদের নেতা বানানোর চেষ্টা করছে। তাইলে বামদেরকে যে মারতে চাইবে তাতে বিস্মিত হবার কি আছে। এবং সেই সাথে ওরা প্রগতিশীল রাজনীতির ধারা চিরতরে নির্মূল করে দিতে চায়- শোষণমুক্ত সমাজের পথ থেকেও ওরা সরে এসেছে। সুতরাং বামদেরকেই তো ওরা হত্যা করতে চাইবে।

আরেকটা কারণে ওরা বামদেরকে হত্যা করতে চায়। ক্ষমতাসীন দলের লেজুড় হওয়ার সুবাদে প্রশাসনের উপর প্রভাবটা ব্যাবহার করে ওরা যে আর্থিক ও অন্যান্য দুর্নীতি ইত্যাদি করে সেটার বিরুদ্ধে কথা বলে কে? ঐ বামরাই তো। তাইলে ওরা বামদেরকে তো পারলে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দিবেই। বামেরা না থাকলে শান্তিতে চুরি করা যায়, শান্তিতে গুণ্ডামি করা যায়। এই বামগুলিই হয়েছে বিশাল যন্ত্রণা, লোক আছে তেরজন সেইগুলি নিয়েই কথায় কথায় লাফিয়ে ওঠে, মানিনা মানবো না। না আছে ভয় না আছে লোভ। তাইলে জবাই না করে ওদেরকে থামাবেন কিভাবে? সুতরাং বামদেরকেই তো হত্যা করতে হবে।

(৪)

শোনেন, আপনারা যারা লাইন ধরে নৌকায় ভোট দেন আর বলেন যে বিকল্প নাই, আপনারা যে বকরীতে পরিণত হয়েছেন সেই খেয়াল আছে? আপনি ছিলেন সেক্যুলার, লিবারেল, প্রোগ্রেসিভ আর এখন পরিণত হয়েছেন ধর্মান্ধ কনজারভেটিভ রিএকশনারি একটি দলের সমর্থক। খেয়াল আছে। আপনি বলতেন বঙ্গবন্ধুর কথা আর আপনাকে এনে ওরা দাড় করিয়েছে বঙ্গবন্ধুর বিপরীত ক্যাম্পে। বকরী আপনি না তো কে? আর এখন আপনার জোর নিয়েই এরা দেশের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রাণবন্ত ছেলেমেয়েগুলিকে ধমক দেয়। দেশের সবচেয়ে সুন্দর সবচেয়ে বুদ্ধিমান ছেলেমেয়েগুলিকে ধমকায়। আপনাদের শরম লাগে না?

বামদেরকে মুল এবং একমাত্র প্রতিপক্ষ হিসাবে চিহ্নিত করেছে ছাত্রলীগ। বিশেষ করে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নকে। এইটা কোন বিশেষ ক্যাম্পাস বা কোন বিশেষ ঘটনার ব্যাপার না। এটা ওদের কেন্দ্রীয় পলিসির ফল। ওদের মুল দলই যেখানে সাম্প্রদায়িকতা ও শোষণের অর্থনীতির নীতি গ্রহণ করেছে সেখানে ছাত্রলীগ আর কি করবে?

ছাত্রলীগ আর আওয়ামী লীগ যে নীতি গ্রহণ করতে চায়, করুক, সে ওদের ইচ্ছা। ওদেরকে আমার বলার কি আছে। আমার পছন্দ না, আমি ওদের দল সমর্থন করি না। আমার বক্তব্য হচ্ছে আপনারা যারা বকরী সেজেছেন ওদের প্রতি। মেহেরবানী করে এই ভণ্ডামিটা করবেন না। নিজেকে প্রোগ্রেসিভ বলবেন, সেক্যুলারও বলবেন আবার আওয়ামী লীগের লেঙ্গুড়ও শুকবেন?