সম্পাদকীয়

নয়ন সমুখে তুমি নাই

প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০১৯     আপডেট: ১৩ আগস্ট ২০১৯

অজয় দাশগুপ্ত

শুধু বজ্রকন্ঠ শুনে বঙ্গবন্ধুকে মূল্যায়ন করলে ভুল হবে। ঠিক যেমন বিদ্রোহী কবিতা পড়ে নজরুলেকে যোদ্ধা বা রাগী ভাবা। দু'জনই ছিলেন প্রেমিক, কোমল ও রসিক বাঙালি।

অভিনেতা সৈয়দ হাসান ইমামের মুখে শোনা গল্প টি অসাধারণ। ঊনসত্তরে বঙ্গবন্ধু নাটক দেখতে গিয়েছিলেন পুরাণো ঢাকায়।

নাটক শেষে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে তিনি ডেকে পাঠালেন সু অভিনেতা গোলাম মোস্তফাকে।

বঙ্গবন্ধুর আন্তরিক আলাপে মুগ্ধ গোলাম মোস্তফা তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন ডাক নামে ডাকতে। চান্দু নামের গোলাম মোস্তফার সাথে বঙ্গবন্ধুর আর দেখা হয় নি অনেক বছর।

স্বাধীনতার পর সুরকার সমর দাশের পুত্র কক্সবাজার বেড়াতে গিয়ে দূর্ঘটনায় পতিত হলে তাকে বাঁচানোর জন্য দ্রুত ঢাকায় আনা প্রয়োজন হয়ে পড়ে। সমর দাশের আরো এক ছেলে পশ্চিম পাকিস্তানে এমন এক দূর্ঘটনায় মারা যায়।

শিল্পী অভিনেতা সুধীজনেরা ঠিক করেন তারা বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করে হেলিকপ্টার করে ছেলেটিকে ঢাকায় আনার উদ্যোগ নেবেন।

দেশে তখন হাতে গোণা কয়েকটি হেলিকপ্টার। সবগুলো উড়ে গেছে বন্যা দূর্গত এলাকায়।

একটি অপেক্ষা করছিল বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বন্যা দূর্গত এলাকায় যাবে বলে। আগত অতিথিদের দেখে বঙ্গবন্ধু অবাক হলেও তাঁর স্বভাব সুলভ উদারতায় হেলিকপ্টার টি কক্সবাজার পাঠিয়ে দেন।

বলেন, আমার সমরের ছেলের জীবন বাঁচুক। আমি একঘন্টা পরে গেলে কোন ক্ষতি হবে না।

কৃতজ্ঞ শিল্পী সুরকার অভিনেতারা বেরিয়ে আসার পথে বঙ্গবন্ধু আঙুল উঁচিয়ে পেছনে থাকা একজনকে ডাকেন। হতবাক ও বিস্মিত করে দিয়ে বলেন, তুই চান্দু না? জানতে চান, কেমন চলছে গোলাম মোস্তফার অভিনয়।

এমন প্রখর স্মৃতিশক্তির পরিচয় দিয়েছেন বারবার। মূলত এ হচ্ছে ভালোবাসা ও মানুষকে মূল্য দেয়ার এক অপার উদাহরণ।

স্বাধীনতার পর কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় এসেছিলেন বাংলাদেশে। তিনিও বঙ্গবন্ধুর সাথে মিলিত হবার সুযোগ পেয়েছিলেন। সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন কেমন করে চমকে দিয়ে তাঁর কবিতা শুনিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তাও একটি না, একাধিক।

রসবোধে ও অসাধারণ ছিলেন তিনি। স্বাধীনতার পর "স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই " নামে কলাম লিখে হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিলেন সাংবাদিক লেখক নির্মল সেন। তাঁর বাড়ী ও বঙ্গবন্ধুর কাছাকাছি।

আজীবন রাজনৈতিক বিরোধিতা করলেও তিনি ঠিকই যেতেন বত্রিশ নাম্বারে। বলাবাহুল্য খাওয়া দাওয়া না করে ফিরতেন না।

একবার এমন এক খাবার টেবিলে বঙ্গবন্ধু নির্মল সেন কে মজা করে বলেছিলেন, বুঝলি নির্মল দুনিয়ার কত লোক চিনলো জানলো,ফসোস তুই র কামালের মা আমারে চিনলি না।

মৃত্যুর অল্প আগে চট্টগ্রাম এসেছিলেন বেতবুনিয়া উপগ্রহ ভূ কেন্দ্রের উদ্বোধনে। তখন তাঁর ঠান্ডা লেগে গলা বন্ধ। কথা বলতে কষ্ট হয়। তারপরও তাঁকে কি না বলিয়ে ছাড়বে সমবেত হাজার হাজার ছাত্র জনতা? পথে পথে মানুষ আর মানুষ।

চট্টগ্রাম কলেজের সামনে গাড়ী থেকে নেমে রবীন্দ্রনাথের দু পংক্তি শুনিয়েছিলেন।

চারিদিকে নাগিনীরা ফেলিতেছে

বিষাক্ত নিঃশ্বাস 

শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে

ব্যর্থ পরিহাস।

এমন কবি, রসিক, কোমল ও সাহসী জনককে মেরে ফেলেছি, এমন বাঙালিকেও বাঁচতে দেই নি আমরা।

হায় অগাস্ট।