সম্পাদকীয়

ধারাবাহিক

বঙ্গবন্ধু চলে গেছে সেটা লিখব না, "লিখবো বাঙালি তাকে হত্যা করেছে" (২য় পর্ব)

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০১৯     আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০১৯

মোঃ তৈমুর মল্লিক ভূঁইয়া, উপ-সম্পাদক ■ বাংলাদেশ প্রেস

আমি যখন মাধ্যমিক পড়ি, তখন আমার ইলেক্টিভ ম্যাথম্যাটিকস  শিক্ষক জহর লাল বসু বলেছিলেন "নেতার নেতৃত্ব আর কমান্ডারের নেতৃত্ব এক নয়। ঠিক তেমনি একজন আদর্শ নেতা ও কমান্ডার এক নয়"। 

বিষয়টা তখন গভীর ভাবে না বুঝলেও আজ বুঝি তিনি কথাটা সত্যি বলেছিলেন। 

কমান্ডার শব্দের সাথে সমরাস্ত্রের একটি সম্পর্কের গন্ধ খুঁজে পাওয়া যায় অথবা কোন ছোট দলে বিভক্ত হয়ে যাওয়া বা বিভক্ত করে দেয়া দলকে লজেস্টিক সাপোর্ট এর জন্য নিয়োজিত হিসাবে দেখা যায়।  অন্যদিকে একজন আদর্শ নেতার সাথে মিশে থাকে সকল বিষয়ের মিশ্রিত একটি প্রধান চরিত্র। অর্থাৎ একজন নেতা যদি হয় মহা সমুদ্র, অপরদিকে একজন কমাণ্ডার সেই সমুদ্র হতে কিছু জলরাশির নিয়ে প্রবাহিত একটি মাত্র দিক।  

আমরা শ্রীলঙ্কার তামিল টাইগার বিদ্রোহী দলের নাম শুনেছি। দেখেছি এক তামিল টাইগার শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন বিষয়ে মতোবিরোধ পোষণ করে সেই দেশেরই সরকারের সাথে। বিরোধের তিব্রতা শেষ পর্যন্ত গৃহযুদ্ধে রূপ লাভ করে। কিন্তু বিদ্রোহী তামিল টাইগার নেতা প্রভাকরণের মৃত্যুর মাধ্যমে শেষ হয় সেই গৃহযুদ্ধ। 

এখানে লক্ষনীয় আমি প্রভাকরণকে তামিল টাইগার নেতা হিসাবে উল্লেখ করেছি, প্রায় সকলেই সেটাই করে। কিন্তু তামিল টাইগারের প্রধান প্রভাকরণ কখনই নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন অস্ত্রধারী একজন কমাণ্ডার। যিনি লিড দিয়েছেন দেশের মধ্যে একটি অংশকে। আর তাই সেই প্রভাকরণের মৃত্যুর পর তামিল টাইগারের সকল চাওয়ার সমাপ্তি ঘটে। 

এটাই হয়, একজন কমাণ্ডার তার কাজে জয় পেতেও পারেন, নাও পেতে পারেন।  তবে একজন আদর্শ নেতার পরাজয় বলতে কিছু নেই। শারিরীক ভাবে কোন আদর্শ নেতা যদি অনুপস্থিতও হন তবুও শুধু নেতৃত্বের যে বায়বীয় রূপ সেটার জন্যই জয় আসবেই। কারন একজন আদর্শ নেতা নিজে নিরস্ত্র হয়েও তিনি তার ত্যাগের মাধ্যমে সবার মধ্যে যে তেজ, যে উম্মাদনা জাগিয়ে তোলেন, সেই তেজে সেই উম্মাদনা শেষ পর্যন্ত জয় ছিনিয়ে আনবেই।  

এখানেই একজন কমাণ্ডার আর আদর্শ নেতার মধ্যে পার্থক্য। 

ফিলিস্তিনির বর্তমান অবস্থায় দেখা যায় হামাস ও ফাতাহ এই দুইটি দলের টানাটানি। ফাতাহ নেতা মির্জা আব্বাস, হামাস নেতা খালেদ মিশাল বা ইসমাইল হানিয়ে এরা সবাই সমরাস্ত্রবাহী এক একজন কমাণ্ডার।  তারা নেতা হতে পারেন নি। নেতা হতে গেলে যে ত্যাগের ভাস্বর রাখতে হয় সেটার প্রমান মেলেনি গাজা এলাকা দখল নিয়ে নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের জন্য। তাছাড়া ক্ষমতার কাড়াকাড়িতো আছেই।  

যদি কাশ্মীরের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই, বিগত প্রায় ৮০ বছরে নাম উল্লেখ করার মতো একজন নেতা জন্ম নিয়েছে। ঘুরে ফিরে সেখানে দেখতে পাই ভারত সরকার ও পাকিস্তান সরকারকে। 

ভালই হলো সরকার নামক শব্দ লিখে ফেলার জন্য।  একটি দেশের সরকার প্রধান হওয়ার সাথে নেতা শব্দের কোন সম্পর্ক নেই। সরকার প্রধান যে কেউই হতে পারেন। কথা কিন্তু নেতা সকলেই নয়। 

অথচ আমরা বাঙালি জাতি পেয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুকে। তিনি পেরেছিলেন নেতা হতে। তার সবচেয়ে বড় প্রমান যা আমি পূর্বেই উল্লেখ করেছি। 

প্রথমত তিনি সমরাস্ত্রে সজ্জিত কোন নেতা নন। চোখে মোটা কালো চশমা আর পরনে সাদা পায়জামা আর পাঞ্জাবি, কালো রঙের হাতাকাটা একটি কোর্ট পরিহিত আপাদমস্তক একজন নেতা। তিনি যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে অনুপস্থিত হয়েছিলেন, তাকে বন্দী করে নিয়ে যাওয়া হয়। তাইবলে কি যুদ্ধ থেমে গিয়েছিলো?  যায়নিতো। বরং আরো বিস্ফোরিত হয়ে বাঙালি জাতি স্বাধীন হয়েছিলো। বাঙালি জাতির উপরে নেতার এক অদৃশ্য শক্তি ভরকরেছিলো।  

সেই বাঙালিই তাকে হত্যা করলো নির্মম ভাবে। এ যে কত বড় গ্লানি, কত বড় লজ্জা, কত বড় পশুত্ব সেটা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন শুধু নয়, রীতিমতো অসাধ্য। 


চলবে ------