সম্পাদকীয়

ফারহানার বিরুদ্ধে কি শপথ ভঙ্গের মামলা হবে!

প্রকাশ: ১২ জুন ২০১৯

সায়েদুল আরেফিন

জাতীয় সংসদের বৈঠকে যোগ দিয়ে প্রথম দিনেই মহান জাতীয় সংসদ ও সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দেগেছেন বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ রুমিন ফারহানা। বিএনপির একমাত্র নারী সাংসদ রুমিন ফারহানা গত মঙ্গলবার প্রথম সংসদ বৈঠকে অংশ নিয়ে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন। বক্তব্যের শুরুতে রুমিন বলেন, ‘সংসদে আজ আমার প্রথম দিন। যেকোনো রাজনীতিবিদের মতোই সংসদে আসা, সংসদে দেশের কথা, মানুষের কথা বলা আমার স্বপ্ন ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমি এমন একটি সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছি যে সংসদটি জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়।’ তবে উনি কার ভোটে সাংসদ হয়েছেন তা তিনি উল্লেখ করেন নি তাঁর বক্তব্যে। অবৈধ সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি বৈধ কথা বলতে পারেন কি না তাও পরিষ্কার করেন নি সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ রুমিন ফারহানা।     

এর আগে রুমিন তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, ‘- এই সংসদটি জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়। সুতরাং আমি খুশি হব যদি এই সংসদের মেয়াদ আর একদিনও না বাড়ে।’ রুমিন তাঁর বক্তব্যে যা বলেছেন তাঁর মধ্য থেকে দুটি কথা নিয়ে আসুন একটু আইঙ্গত দিক খতিয়ে দেখে নিই। কারণ তিনি আইন পেশার লোক, বর্তমানে বাংলাদেশের আইন সভার সদস্য। উনি অন্যদের মত জনগনের ভোটের এমপি নন। উনি তাঁর ভাষায় ‘রাতের ভোটে নির্বাচিত এমপি’ও নন। ‘লন্ডন রহমানের’ দয়ায় উনি এমপি তা সবার জানা। তাই বঙ্গবন্ধুর খুনি খন্দকার মোস্তাকের সহযোগী অলি আহাদের মেয়ে রুমিন ফারহানা বিভিন্ন সময় বলেছেন, ‘সংসদ অবৈধ’ এই ‘সরকার অবৈধ’ ‘সরকারের সকল কর্মকাণ্ড অবৈধ’। চমৎকার বলেছেন বঙ্গবন্ধুর খুনি খন্দকার মোস্তাকের সহযোগীর মেয়ে রুমিন ফারহানা এম পি। যেহেতু তিনি আইন পেশার মানুষ তাই আসুন সবাই আনন্দ পাবেন এমন করে একটু আইন নিয়ে কথা বলে দেখি।   

বাংলাদেশে বলবৎ ১৮৭২ সালের চুক্তি আইনের ২(জ) ধারা মতে-“আইনের দ্বারা বলবৎযোগ সম্মতিকে চুক্তি বলে।” আইন বিশারদ মিঃ স্যামন্ড এর মতে, “বিভিন্ন পহ্মে্র মধ্যে সৃষ্ট এবং চিহ্নত দায় অথবা দায়িত্ব সম্পর্কিত সম্মতিকে চুক্তি বলে।”  চুক্তির উপাদান তাহলে কি কি তাঁর দুই একটা দেখে নিতে দোষের তো কিছু নেই। চুক্তির উপাদানগুলোর মধ্যে মোটা দাগে বলতে গেলে - দুই বা ততোধিক পক্ষ, বৈধ প্রস্তাব, প্রস্তাব গ্রহণ, বৈধ প্রতিদান, চুক্তি সম্পাদন যোগ্যতা মানে বৈধতা অর্থে, পক্ষগণের স্বাধীন সম্মতি, চুক্তিটি লিখিত এবং নিবন্ধিত হতে হবে, ইত্যাদি। যা হউক আমরা আইন নিয়ে বেশি কপচাব না। শুধু বুঝার জন্য আইনের কিছু ধারাকে অধিকাংশের কাছে গ্রহনযোগ্য একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করবো। অনেকে বলতে পারেন কী দরকার এসব! দরকার আছে কোন দেশে বাস করে আপনি বিলতে পারেন না যে আমি আইন জানি না। ইংরেজীতে “Ignorance of law is no excuse” আইন শাস্ত্রের এই প্রবাদ বাক্যটি শত শত বছর ধরে দেশ হতে দেশে সারা বিশ্বে এক চিরন্তন সত্য বাক্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলায় এই বাক্যটির অর্থ দাঁড়ায় আইনের অজ্ঞতা ক্ষমার অযোগ্য কিংবা আইনের অজ্ঞতা ক্ষমার কোন কারণ হতে পারে না। অর্থাৎ রাষ্ট্র ধরে নিবে যে সংশ্লিষ্ট প্রচলিত আইনটির বিধি-বিধান সম্পর্কে নাগরিকরা জানেন। তাই যদিও বাস্তবে আপনি সংশ্লিষ্ট আইন সম্পর্কে না জেনে উক্ত আইনটির কোন বিধি-বিধান লঙ্গন করেন আর পরে যদি আপনি সংশ্লিষ্ট আইনটি সম্পর্কে জানেন না বলে কোন অজুহাত দেখান তবুও তা রাষ্ট্রের কাছে কোন ভাবে গ্রহণযোগ্য হবে না। তাঁকে কি আইন ভঙ্গ বা শপথ ভঙ্গ করার কারণে শাস্তি পেতে হবে।    

অন্যভাবে বলতে গেলে, রুমিন ফারহানা চুক্তি আইনের ধারা মেনেই হয়তো আইনের চোখে বৈধ কর্তৃপক্ষের সাথে লিখিত চুক্তিতে স্বাধীন সম্মতির মাধ্যমে উনি এমপি হয়েছেন বলে ধরে নেওয়া যায়। উনি সংসদকে, সরকারকে অবৈধ বললে উনার তো সংসদ সদস্য হিসেবে যে শপথ নিয়েছে সেই সংসদ সদস্য পদ থাকে কি! কারণ অবৈধ কর্তৃপক্ষের সাথে সম্পাদিত সব চুক্তিই অবৈধ বা আইনের চোখে মূল্যহীন কাগজের মত, শপথ ভঙ্গও অপরাধ। উনি এমপি হিসেবে শপথ নিয়ে যে কাগজে সই করেছেন সেটাও তাহলে অবৈধ হয়ে যায়। তাহলে এখন কী বলবেন রুমিন ফারহানা? অবৈধ সম্পর্কের জালে জড়িয়ে উনি পার পাবেন কী? আইন কী বলে? ভাগ্যিস বাংলাদেশে টট আইনের ব্যাপক প্রয়োগ আর ব্যবহার নেই, থাকলে তো উনার খবর ছিল। উনার পাকিস্তানি বয়ফ্রেন্ড, যার ছবি এখন ফেসবুকে ভাইরাল সেই আইনজ্ঞ কী এসে আইনী সহায়তা দিতেন তখন! যেমনটি করে তাঁদের নেত্রী খালেদা জিয়ার জন্য উকিল নিয়োগের চেষ্টা হয়েছিলো এর আগে!     

আইনের ছাত্রদের অনেকেই বলছেন, রুমিন ফারহানা এমপি চুক্তি বা শপথ ভঙ্গের দায়ে দোষী, উনার সাংসদ থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন। চুক্তি ভঙ্গের বা শপথ ভঙ্গের দায়ে কি উনার বিরুদ্ধে কোন মামলা হবে? নাকি তিনি তাঁর ভাষায় বাংলাদেশের ‘অবৈধ সংসদের’ সাথে তাঁর ‘অবৈধ সম্পর্ক চালিয়ে, অবৈধ সব সুযোগ সুবিধা নিতে থাকবেন? সময় হয়তো এর জবাব দেবে।  


© সায়েদুল আরেফিন