সম্পাদকীয়

কচুকাটা হবে কিছু আওয়ামী লীগ নেতা!

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০১৯

সায়েদুল আরেফিন

আওয়ামী লীগের বেশ কিছু নেতা ইদানিং আতংকে দিন কাটাচ্ছেন। নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁরা চিন্তিত হয়ে টাকা কামানোর বা ক্ষমতা দখলের ধান্দায় ব্যস্ত। ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে মৃদু সুনামির আভাস ক্রমে ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। এতে অনেক ‘হাইব্রিড' আওয়ামী ‘কাউয়া’-‘কোকিল’দের করুণ পরিণতির পূর্বাভাষ পাওয়া যাচ্ছে। এভাবেই বঙ্গবন্ধু কন্যা ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা তার দলের মধ্য থেকে রাজনৈতিক দুর্নীতি নির্মূলের অভিযান শুরু করতে যাচ্ছেন বলে মনে করা হচ্ছে।       

অনেকেই লক্ষ্য করে থাকতে পারেন যে, সারা দেশের মানুষের কাছে আওয়ামী লীগে ‘হাইব্রিড' ও ‘কাউয়া' শব্দ দু'টি বহুল পরিচিত৷ এখন যোগ হয়েছে আওয়ামীপন্থী বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন। উল্লেখিত দু'টি শব্দ কয়েক বছর আগে সামনে নিয়ে আসেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জননেতা ওবায়দুল কাদের৷ মূলত যারা সুযোগ সুবিধার জন্য বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগে যোগদান করেছেন তাদেরই তিনি ওই দুই নামে অভিহিত করেছেন৷ এই নব্য আওয়ামী লীগের কারণে কোথাও কোথাও মূল আওয়ামী লীগই কোণঠাসা হয়ে পড়েছে এখন৷ বিভিন্ন সরকারী দপ্তরে আওয়ামী লীগ পন্থী পেশাজীবী সেজে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে চালাচ্ছে ব্যাপক দুর্নীতি। এটা বিভিন্ন সূত্রে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার গোচরীভূত হয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে গত ৫ মার্চ ২০১৯ তারিখ শুক্রবার আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে তার সরকারি বাসভবন গণভবনে অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেই প্রথমেই দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যাওয়া নেতাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়।  

গত ০৬ই এপ্রিল তারিখের খবরে জানা যায় যে, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নৌকা ও নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রচার-প্রচারণায় অংশ নেয়া দলীয় নেতাকর্মী, এমপি ও মন্ত্রীদের শোকসের সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। দ্রুত এই শোকস নোটিস সংশ্লিষ্টদের ঠিকানা বরাবর পাঠিয়ে দেয়া হবে বলে বলা হয়। এতে বলা হয় যে, কারণ দর্শানোর নোটিস করার ৭ দিনের মধ্যে তাদের জবাব দিতে হবে। এ ছাড়া ভবিষ্যতে কোন নির্বাচনে এসব মন্ত্রী-এমপি ও নেতারা নৌকা প্রতীক পাবেন না বলেও বৈঠক থেকে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়। সূত্র জানায়, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে যারা নৌকার বিরোধিতা করেছেন, নৌকার নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করেছেন, মারামারি করেছেন তারা যাতে আর কোনদিন নৌকা প্রতীক না পায় সে বিষয়েও কেন্দ্রীয় নেতাদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 

বৈঠক সূত্রে বলা হয়, জাতীয় সম্মেলনকে সামনে রেখে গঠিত ৮ বিভাগীয় টিমকে তৃণমূলে গিয়ে দ্রুত কাজ করার তাগিদ দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। একই সঙ্গে যেসব উপজেলা আওয়ামী লীগ কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে, দ্রুততম সময়ে সেসব উপজেলা কমিটি সম্মেলনের মাধ্যমে সম্পন্ন করার তাগিদও দিয়েছেন তিনি।

বৈঠক সূত্র জানায়, বৈঠকে দলের প্রত্যেক বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদকরা স্ব স্ব বিভাগে যারা দলীয় প্রার্থীর বিরোধিতা করেছেন তাদের তালিকাসহ প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন। বৈঠকে এসব প্রতিবেদন উপস্থাপনের কথা ছিল। তবে অনেক জেলা থেকে এ সংক্রান্ত তথ্য না পাওয়ায় পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরির জন্য আরও সাতদিনের সময় দেয়া হয়। প্রতিবেদন তৈরির পর সেগুলো দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফের কাছে জমা দেবেন।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তীব্র ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, নৌকা প্রতীকে এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর অনেক এমপিই এখন নৌকার বিরোধিতায় নেমেছেন। অনেকে তো আবার নৌকার বিরোধী প্রার্থীর পক্ষে রাস্তায় নেমে মিছিল পর্যন্ত করেছেন। যা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

সূত্র জানায়, বৈঠকে আগামী অক্টোবরে দলের জাতীয় সম্মেলনের আগেই সারাদেশে দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিরসন করে দলের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ও শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ লক্ষ্যে ইউনিয়ন থেকে শুরু করে জেলা-মহানগর পর্যন্ত দলের মেয়াদোত্তীর্ণ তৃণমূল সম্মেলনগুলো শেষ করার সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়। একই সঙ্গে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সারাদেশে দলীয় উদ্যোগে সাড়ম্বরে ‘মুজিব বর্ষের’ অনুষ্ঠানমালা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

মে মাসের ১২ তারিখে পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে আওয়ামী লীগের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক জননেতা মাহবুব-উল-আলম হানিফ এমপির বরাতে বলা হয় যে, স্থানীয় নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের বিরুদ্ধে যেসব এমপি কাজ করেছেন, তাদের তালিকা নেত্রীর কাছে রয়েছে। আগামীতে তারা নৌকার মনোনয়ন পাবেন না। কর্মীরা প্রায়ই বলেন কই কিছুই তো হয় না। কিন্তু নৌকার বিরোধিতাকারীরা একদিন না একদিন এর ফল পাবেই। যশোর জেলা পরিষদ মিলনায়তনে জেলা আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এই কথা বলেন। 

এদিকে গত সোমবার ২৪শে জুন ২০১৯ তারিখে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জননেতা জনাব ওবায়দুল কাদের কাউলায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কার্যক্রম পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের এক সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাবে উপজেলা নির্বাচনে নৌকার বিরোধিতা করায় সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন যে, পরবর্তী ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং এ, যা খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হবে, যারা উপজেলা নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীর বিরোধিতা করেছে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হবে।  

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এবার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে যারা তারেক জিয়ার বিএনপি ও জাতীয় পার্টির মত করে স্থানীয় পর্যায়ে নমিনেশন বানিজ্য এবং কমিটি বানিজ্যের সূচনা করেছেন সেই সব দুর্নীতিবাজ নেতার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার কচুকাটা করবেন বঙ্গবন্ধু কন্যা ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এখান থেকেই দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া, আর তৃণমূলে যারা দলের কমিটি নিয়ে ত্যাগীদের বঞ্চিত করে বড় নেতা বনে গেছেন তাঁদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের উপর খড়গ নেমে আসতে পারে। এভাবেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তার দলের অভ্যন্তরের সাংগঠনিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে অন্য দুর্নীতিবাজদের সাবধান বানী জানাবেন, সেই সম্ভাবনা উজ্জ্বল। নিজের ঘোর থেকেই শুরু হবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাফসুতরো অভিযান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে। অপেক্ষায় আছেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের মত সহযোগী সংগঠনগুলো।     

© সায়েদুল আরেফিন