রাজধানী

হলি ফ্যামিলি দিয়ে বন্ধ শুরু কভিড হাসপাতাল

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ |

নিজস্ব প্রতিবেদক ■ বাংলাদেশ প্রেস

সরকার কভিড হাসপাতাল বন্ধ করতে শুরু করেছে। গতকাল বুধবার প্রথম হাসপাতাল হিসেবে বেসরকারি হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কভিড চিকিৎসা বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এর আগে গত ২৬ আগস্ট রোগী কমে গেছে এমন ১২টি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল বন্ধের সুপারিশ করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে তালিকা দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর সাত দিনের মধ্যে এসব হাসপাতাল বন্ধের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে শুরু করল মন্ত্রণালয়।

যদিও সরকার রোগী কমে গেছে এমন হাসপাতাল বন্ধ করার কথা বলেছিল। কিন্তু পরে সিদ্ধান্ত হয়েছে প্রথমে ব্যয়বহুল হাসপাতাল বন্ধ করা হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা  জানান, হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের পেছনে সরকারের প্রতি মাসে ৮ কোটি টাকা ব্যয় হতো। সে হিসাবে গত চার মাসে সরকারের ব্যয় হয়েছে ৩২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেতন ও চিকিৎসা খরচ রয়েছে। তবে এখনো পুরো টাকা পরিশোধ করা হয়নি। কিছু বাকি আছে। এর বাইরে হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের রাখতে হোটেল ও খাওয়া-দাওয়া ব্যয়ও করতে হয়েছে সরকারকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে যে অনুপাতে ব্যয় ধরা হয়েছে, সে অনুপাতে রোগী নেই। এছাড়া অন্য হাসপাতালের তুলনায় এখানে বেতন-ভাতাও বেশি। তাই সরকার প্রথমে এ হাসপাতাল বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরপর অন্য বেসরকারি হাসপাতাল ও পরে অন্য সরকারি কভিড হাসপাতাল বন্ধ করা হবে।

গত ১০ মে হলি ফ্যামিলি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৭০০ শয্যার মধ্যে ৫০০টি করোনা রোগীর চিকিৎসার জন্য বরাদ্দ করে সরকার। চুক্তি অনুযায়ী আগামী অক্টোবর পর্যন্ত কভিড চিকিৎসা দেওয়ার কথা হাসপাতালটির। তবে প্রয়োজন সময় আরও বাড়ানো হবে বলেও চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. ফরিদ হোসেন মিয়া  বলেন, কোন হাসপাতাল বন্ধ করা যায়, এমন তালিকা চেয়েছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। সে অনুযায়ী রোগী কমে গেছে এমন ১২টি হাসপাতালের তালিকা পাঠিয়েছিলাম। এর মধ্যে আজ (গতকাল বুধবার) প্রথম হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল বন্ধের নির্দেশনা এসেছে। এখন অধিদপ্তর হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করবে কবে থেকে বন্ধ করা হবে। এরপর হাসপাতালটি আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। তারা সেখানে কোনো কভিড কর্নার রাখবে কি না, সেটা তাদের সিদ্ধান্ত। এ ব্যাপারে অধিদপ্তরের কোনো নির্দেশনা নেই। এ পরিচালক বলেন, আমরা শুধু লোকবল দিয়েছিলাম। অন্যকিছু দিইনি। লোকবল ফিরিয়ে আনা হবে। যেসব হাসপাতালে সংকট আছে, তাদের সেখানে দেওয়া হবে।

হাসপাতাল পরিচালক আরও বলেন, বেসরকারি হাসপাতালে ব্যয় বেশি। সে কারণে প্রথমে এসব হাসপাতাল বন্ধ করা হচ্ছে। পরে তালিকার মধ্যে থাকা সরকারি কভিড হাসপাতালও নন-কভিড করা হবে। এরপর করোনা পরিস্থিতি বুঝে দেশের অন্যান্য স্থানের কভিড হাসপাতালের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বন্ধের নির্দেশনার চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ মোর্শেদ। গতকাল রাতে তিনি  বলেন, বন্ধের একটা চিঠি পেয়েছি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তারা ব্যবস্থা নেবে কীভাবে কী করা যায়। এখনো ১২৫ জন কভিড রোগী রয়েছে। বন্ধ হতে এ মাস তো লাগবেই। আমাদের অক্টোবর পর্যন্ত চুক্তি করা আছে। তবে এখন সব হাসপাতালেই রোগী কমে গেছে। সরকারি কভিড হাসপাতালগুলোই রোগী পাচ্ছে না। সরকারের অনেক অর্থ খরচ হচ্ছে। কভিড চিকিৎসায় সরকারের যে টাকা দেওয়ার কথা, তার কিছুই পাননি বলে জানান পরিচালক। তিনি বলেন, জুন, জুলাই ও আগস্ট তিন মাসের প্রায় ২৪ কোটি টাকার মতো বকেয়া। কোনো টাকা পাইনি। প্রথম মাসের ১৫ দিনের টাকা ঈদের আগে পেয়েছিলাম।

কবে থেকে কভিড চিকিৎসা বন্ধ হচ্ছে জানতে চাইলে হাসপাতাল পরিচালক বলেন, কভিড হাসপাতাল বন্ধ করতে সময় লাগবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ আইসিইউতে রোগী আছে, ভিআইপি রোগী আছে। এখন যারা চিকিৎসাধীন, তাদের ছাড়তেই দুই-তিন সপ্তাহ সময় লাগবে। এরপর পুরো হাসপাতাল সংক্রমণমুক্ত করার ব্যাপার আছে। তাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে কী করা যায় দেখি।

এদিকে সরকার কভিড চিকিৎসার ব্যয় পরিশোধ না করায় হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের চিকিৎসকসহ সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীর চার মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে বলে জানান হাসপাতালের এক চিকিৎসক। তিনি বলেন, চুক্তি অনুযায়ী বেতন ও চিকিৎসাসহ সমস্ত খরচ সরকারের দেওয়ার কথা। কারণ এ হাসপাতাল সরকারি কোনো অনুদান পায় না। এখানকার এক হাজার চিকিৎসক, নার্সসহ সব কর্মকর্তা-কর্মচারী হাসপাতালের আয় থেকে বেতন পান। একদিকে যেমন চুক্তি অনুযায়ী সরকার টাকা দেয়নি, আবার কভিডের কারণে সাধারণ চিকিৎসা থেকেও আয় বন্ধ। ফলে হাসপাতালে সবার চার মাসের বেতন বকেয়া পড়ে আছে।

হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার কথা ভেবে চুক্তি এভাবে হয়েছিল যে সরকার যদি হঠাৎ করে বন্ধ করে দেয়, তাহলে এক মাস সময় দিতে হবে। কারণ এটাকে আবার সাধারণ হাসপাতাল হিসেবে চালু করতে হলে বেশকিছু প্রস্তুতি আছে। প্রচার করতে হবে। ১৫-২০ দিন লাগবে হাসপাতালকে সংক্রমণমুক্ত করতে। সবমিলে চালু করতে করতে দুই-তিন মাস লেগে যাবে।

তবে এখনই কভিড হাসপাতাল বন্ধ করার বিপক্ষে করোনা মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি। বন্ধের ব্যাপারে কমিটির কোনো পরামর্শ নেওয়া হয়নি বলেও জানান কমিটির ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি  বলেন, হাসপাতাল বন্ধের বিষয়ে কোনো পরামর্শ নেওয়া হয়নি। পরামর্শক কমিটি হাসপাতাল বন্ধের বিষয়ে কোনো পরামর্শও দেয়নি। এখনই বন্ধ হলে লোকজনের ধারণা হবে, পরিস্থিতি বোধহয় ভালো হয়ে গেছে। এতে করে মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলাসহ যেসব স্বাস্থ্যবিধিতে সাধারণ মানুষ অভ্যস্ত হয়েছিল, সেগুলোতে ঢিলেমি আসবে। আমেরিকা, ইতালি, যুক্তরাজ্যে রোগী কমে যাওয়ার পর তাদের প্রস্তুতিতে, প্রতিরোধ কার্যক্রমে কিছুটা শিথিলতা এনেছিল। এ কারণে সেখানে সেকেন্ড ওয়েভ এসেছে। আর আমাদের দেশে যদি সেরকম হয়, তাহলে কিন্তু আমরা অসুবিধায় পড়ে যাব।

বিশেষজ্ঞরা এসব হাসপাতাল বন্ধের আগে সরকারকে পরবর্তী সময়ে এসব হাসপাতালে সব ধরনের রোগীর করোনা টেস্ট ও আইসোলেশন সেন্টার এবং কভিড ও নন-কভিড রোগীদের জন্য পৃথক আইসিইউ কর্নার রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলেছেন, এসব ব্যবস্থা না থাকলে পরে এসব হাসপাতালে সাধারণ রোগীরা চিকিৎসার জন্য আসতে ভয় পাবে এবং আসবে না। এমনকি সরকার যেসব কারণে এসব কভিড হাসপাতাল নন-কভিডে রূপান্তর করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সে সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তারা বলেছেন, সরকারের উচিত হবে করোনার সঠিক বিজ্ঞানভিত্তিক সার্ভিলেন্স করে গতিপ্রকৃতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া। তা না হলে আগের মতোই সিদ্ধান্ত অদলবদল করতে হতে পারে।

এমনকি এখন বন্ধ করলেও করোনা রোগী বাড়লে এসব হাসপাতাল যেন দ্রুত কভিড হাসপাতালে রূপান্তর করা যায়, সে ব্যবস্থা রাখার পরামর্শ দিয়েছেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি  বলেন, কাজেই কোনো হাসপাতাল একেবারেই বন্ধ করা যাবে না। বিশেষ করে সব হাসপাতালেই কঠোরভাবে সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা রাখতে হবে।

এর আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বন্ধের সুপারিশ করে ১২টি কভিড হাসপাতালের তালিকা করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গত ২৬ আগস্ট সে তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এর মধ্যে ঢাকায় নয়টি, সিলেটের একটি ও চট্টগ্রামে দুটি হাসপাতাল রয়েছে। এসব হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের তাদের পুরনো কর্মস্থলে ও যেসব হাসপাতালে জনবল সংকট, সেখানে পাঠানো হবে। হাসপাতালগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ঢাকার লালকুঠি মা ও শিশু হাসপাতাল, মহানগর জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা ও চট্টগ্রামের দুটি বেসরকারি কভিড হাসপাতাল, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, রেলওয়ে হাসপাতাল, সরকারি কর্মচারী, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও চট্টগ্রামের হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতাল।

এর বাইরে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শেখ হাসিনা জাতীয় প্লাস্টিক অ্যান্ড বার্ন ইনস্টিটিউট, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতাল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় কভিড হাসপাতাল হিসেবে চালু থাকবে বলেও সিদ্ধান্ত হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি কভিড-১৯ হাসপাতাল রয়েছে ২৮টি। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে কভিড হাসপাতালের সংখ্যা ১৬টি। বাকি ১২টি চার জেলায়। এর মধ্যে ঢাকা জেলায় একটি, নারায়ণগঞ্জে দুটি, গাজীপুরে একটি ও চট্টগ্রাম জেলায় আটটি কভিড হাসপাতাল রয়েছে। এসব কভিড হাসপাতালের মধ্যে সরকারি হাসপাতালের সংখ্যা ১৯টি। বাকি ৯টি হাসপাতাল বেসরকারি। এর মধ্যে ঢাকা শহরে রয়েছে চারটি, নারায়ণগঞ্জে একটি ও চট্টগ্রামে চারটি।

গত দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন সময়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক রোগী কমে আসায় এবং হাসপাতালে বেড ফাঁকা থাকায় কভিড হাসপাতাল কমানোর কথা বলে আসছিলেন। সর্বশেষ গত মাসের শেষের দিকেও সচিবালয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। রোগী আরও কমে গেলে এ মাসের শেষে কয়েকটি করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল বন্ধ করে নন-কভিড হিসেবে ঘোষণা করা হবে।