সিন্ডিকেটে জিম্মি পেঁয়াজ, চিহ্নিত হওয়ার পরও জড়িতরা অধরা

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ |

নিজস্ব প্রতিনিধি ■ বাংলাদেশ প্রেস

এক বছরের মাথায় দেশের বাজারে পেঁয়াজ নিয়ে আবার কারসাজি শুরু হয়েছে। এবারও চিহ্নিত সিন্ডিকেটটি পেঁয়াজকে জিম্মি করে ফেলেছে। সোমবার ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ ঘোষণার পরপরই সক্রিয় হয়ে ওঠে ওই চক্রের সদস্যরা। তাদের কারসাজিতে ঘণ্টায় ঘণ্টায় বেড়ে কেজিপ্রতি পেঁয়াজের দাম ১২০ টাকা পর্যন্ত ওঠে। হাতিয়ে নিয়েছে কয়েকশ’ কোটি টাকা।

সরকারের নানা পদক্ষেপের পরও এখন পর্যন্ত আসেনি তেমন কোনো ইতিবাচক ফল। তবে বাজারে ক্রেতা কম থাকায় বুধবার আগের দিনের তুলনায় পেঁয়াজের দাম পাইকারি ও খুচরা বাজারে কেজিতে ১৫-৩০ টাকা কমেছে।

এদিন পাইকারি বাজারে একদিনের ব্যবধানে দেশি পেঁয়াজ কেজিতে ২০ টাকা কমে বিক্রি হয়েছে ৭৫ টাকা। আর আমদানি করা পেঁয়াজের কেজিতে ১৫-২০ টাকা কমে বিক্রি হয়েছে ৫৫-৬০ টাকা। খুচরা বাজারে কেজিতে দেশি পেঁয়াজের দাম ২০-৩০ টাকা কমে বিক্রি হয়েছে ৯০-১০০ টাকা। আর আমদানি করা পেঁয়াজ কেজিতে ১৫ টাকা কমে বিক্রি হয়েছে ৮০-৮৫ টাকা।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পেঁয়াজ আমদানিকারকদের একটি গ্রুপ সব সময় ওতপেতে থাকে কখন ভারত রফতানি বন্ধ করে দেয়। সৃষ্টি করে কৃত্রিম সংকটের। এর সুযোগ নিয়ে তারা হুহু করে দাম বাড়িয়ে থাকে। গত বছর পেঁয়াজের দাম ৩০ টাকা কেজি থেকে বেড়ে ৩২০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল।

ওই সময় পেঁয়াজ নিয়ে কারসাজির দায়ে চট্টগ্রাম ও টেকনাফকেন্দ্রিক ১৬ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। সব সময়ই তারা থাকেন অধরা। কারণ, তাদের পেছনে রয়েছে সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা।

গত ৩০ আগস্ট থেকে দেশে পেঁয়াজের দাম বাড়তে থাকে। ওইদিন প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৪০ টাকা কেজি। এর আগে গত জুলাই মাসের শুরুর দিকে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ছিল ৩০-৩৫ টাকা।

৩১ আগস্ট দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৫২ টাকা। ৩ সেপ্টেম্বর আরও বেড়ে ৫৫ টাকা। ৫ সেপ্টেম্বর হয় ৭০ টাকা। ১৪ সেপ্টেম্বর ভারত রফতানি বন্ধ করলে দাম আরও বেড়ে ৮৫ টাকা ছাড়িয়ে যায়। পরদিন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে ১২০ টাকা কেজি পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে।

জানতে চাইলে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অসাধু সিন্ডিকেটের কারণে পেঁয়াজের দাম বাড়ছে। যারা অসাধু ব্যবসায়ী, তারা অত্যন্ত প্রভাবশালী। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার মতো সৎসাহস আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অথবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নেই। আবার কর্তৃপক্ষ বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কেউ কেউ এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, সুবিধাভোগী। যে কারণে এটি একটি দুষ্টচক্রের মধ্যে পড়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া যায়নি। আর সাধারণ মানুষ এই দুষ্টচক্রের হাতে জিম্মি।

তিনি আরও বলেন, মূল বিষয় হল- সুশাসনের ঘাটতি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নেই। এখানে কারও নিয়ন্ত্রণ নেই। সুশাসন নিশ্চিত না হলে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আসবে না।

ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করছে এমন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কনজুমার ইয়ুথ বাংলাদেশ (সিওয়াইবি)। জানতে চাইলে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক পলাশ মাহমুদ বলেন, পেঁয়াজ নিয়ে পুরনো সিন্ডিকেট আবারও সক্রিয় হয়েছে। পেঁয়াজ নিয়ে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গত বছর একটি চক্র মানুষকে জিম্মি করে অর্থ লুট করেছিল। এদের চিহ্নিত করার পরও ওই সময় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হয়নি। যে কারণে এবারও তারা সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশে পেঁয়াজের মজুদ ও সরবরাহ স্বাভাবিক পর্যায়ে রয়েছে। দেশে এখন থেকে নতুন পেঁয়াজ আমদানি না হলেও যে পরিমাণ মজুদ রয়েছে, তা দিয়ে আড়াই মাসের চাহিদা মেটানো সম্ভব। অর্থাৎ, দেশে ৫ লাখ টন পেঁয়াজ মজুদ রয়েছে। এর বাইরে পাইপলাইনে আছে আরও পেঁয়াজ।

ভারত রফতানি বন্ধ করার পর পেট্রাপোল সীমান্তে প্রায় ১৫০টি পেঁয়াজবোঝাই ট্রাক আটকে রয়েছে। সেখানে ৪৫০ টন পেঁয়াজ রয়েছে। এগুলো ছাড় করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ব্যাংকিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আরও ১৯ হাজার টন পেঁয়াজ দেশে আসার অপেক্ষায় রয়েছে।

এর বাইরে সংকট মোকাবেলায় ভারতের বিকল্প আরও ৬ দেশ থেকে আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দেশগুলো হচ্ছে : চীন, মিয়ানমার, মিসর, তুরস্ক, নেদারল্যান্ডস ও পাকিস্তান।

বেসরকারিভাবে আমদানিকারকরা ওই সব দেশ থেকে আমদানির জন্য ১০১টি অনুমতিপত্র সংগ্রহ করেছে উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্র থেকে। ফলে প্রথম পর্যায় ৪০ হাজার টন পেঁয়াজ দেশে আনা সম্ভব হবে, যা আগামী ৭ দিনের মধ্যে দেশের বাজারে আসবে।

এ ছাড়া পর্যায়ক্রমে আরও আমদানি বাড়বে। এর মধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে তুরস্ক থেকে এক লাখ টন পেঁয়াজ আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বুধবার বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, বর্তমানে দেশে ৫-৬ লাখ টন পেঁয়াজ রয়েছে। নতুন পেঁয়াজ ওঠা পর্যন্ত আমাদের আরও প্রায় চার লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হবে। ইতোমধ্যে টিসিবি টার্কি (তুরস্ক) থেকে পেঁয়াজ আমদানির জন্য এলসি খুলে ফেলেছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টিসিবির মাধ্যমে এক লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করব। দেশে পেঁয়াজ নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। ঘাটতি যে পরিমাণে আছে, তা এক মাসের মধ্যে বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করে পূরণ করা হবে। এক মাস আমাদের সাশ্রয়ী হতে হবে। এক মাসের মধ্যে সাপ্লাই চেইন ফুল করে দেব। তিনি জানান, বর্ডারে আটকে থাকা পেঁয়াজ দু-এক দিনের মধ্যে প্রবেশ করার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া দেশের বাজারে যারা পেঁয়াজের দাম বাড়িয়েছে, সেসব অসাধু ব্যবসায়ীর জন্য জেল-জরিমানা বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

একাধিক আমদানিকারক জানান, গত বছরের মতো এবারও পেঁয়াজ নিয়ে ভারত ঝামেলা করতে পারে। যার কারণে বেসরকারিভাবে ৩ সেপ্টেম্বর থেকে বিকল্প ৬টি দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ফলে ভারত রফতানি বন্ধের ১১ দিন আগে থেকেই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের আওতাধীন উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের কাছ থেকে বেসরকারি খাতের আমদানিকারকরা ১০১টি আমদানি অনুমতি পত্র সংগ্রহ করে। ওইসব দেশ থেকে প্রথম পর্যায়ে প্রায় ৪০ হাজার টন পেঁয়াজ আনার অনুমতি দেয়া হয়। আগামী ৭ দিনের মধ্যেই এসব পেঁয়াজ দেশে আসবে বলে জানা গেছে।

জানতে চাইলে উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের উপপরিচালক ড. আসাদুজ্জামান বুলবুল বলেন, ভারত ছাড়াও অন্যান্য দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করার জন্য দেশের আমদানিকারকদের আবেদন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা পত্র গ্রহণ করছি। ইতোমধ্যে আমরা ১০১টি পত্র ইস্যু করেছি। প্রথম পর্যায়ে অনুমতি পেয়ে ৩০টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ৪০ হাজার টন পেঁয়াজ দেশের বাজারে আসবে। পর্যায়ক্রমে আরও বিপুল পরিমাণে পেঁয়াজ বাংলাদেশে ঢুকবে।

এদিকে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেঁয়াজের নতুন মৌসুম আসতে এখনও ৬ মাস বাকি। অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে নতুন দেশি পেঁয়াজের জন্য। এ সময়ে মধ্যে দেশে পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে ১১ লাখ টন। বর্তমানে মজুদ আছে ৫ লাখ টন। পেঁয়াজের ঘাটতি রয়েছে ৬ লাখ টন। আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে দেশে এই ৬ লাখ টন পেয়াজ আমদানি করতে হবে। এ ব্যাপারে বাণিজ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, দেশে প্রতি বছর যে পরিমাণে পেঁয়াজ আমদানি হয় তার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই আসে ভারত থেকে। বাকি ১০ থেকে ২০ শতাংশ আসে পেঁয়াজ আসে মিয়ানমার, তুরস্ক ও চীন থেকে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে ২ কোটি ৯০ লাখ ডলারের। গত অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি করা হয়েছিল ৩ কোটি ৬০ লাখ ডলারের। গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময়ে পেঁয়াজের আমদানি কমেছে প্রায় ১৮ শতাংশ।

এদিকে পেঁয়াজের চাহিদা বেড়েছে। গত উৎপাদন মৌসুমে ভারতে পেঁয়াজের উৎপাদন কম হওয়ায় সে দেশ থেকে আমদানির মূল্যও বেড়েছে। আগে যেখানে ২৫০ থেকে ৩০০ ডলারে প্রতি টন পেঁয়াজ আমদানি করা যেত। এখন এর রফতানি মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০০ থেকে ৪৩০ ডলার। যে কারণে পরিমাণে পেঁয়াজ আমদানিও কমেছে।

এদিকে ১ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে ৪৮ লাখ ডলারের। এর মধ্যে আমদানির অপেক্ষায় আছে সাড়ে ৫৮ লাখ ৬০ হাজার ডলারের পেঁয়াজ। ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয়ায় এখন এসব পেঁয়াজ আটকে রয়েছে। সেগুলো এখন ভারতের স্থল বন্দর থেকে ছাড় করা হচ্ছে না।

এদিকে ব্যাংকিং নিয়ম অনুযায়ী যেসব পণ্যের আমদানির দেনা পরিশোধ করা হয় সেগুলো ছাড় করার নিয়ম রয়েছে। এ হিসাবে ৫৮ লাখ ৬০ হাজার ডলারের পেঁয়াজ ছাড় করার জন্য সরকারিভাবে তৎপরতা চলছে।

শ্যামবাজারের পেঁয়াজ পাইকারি ব্যবসায়ী শংকর চন্দ্র ঘোষ বলেন, দেশে এখনও পর্যাপ্ত পেঁয়াজ আছে। চলতি মাসের প্রথম থেকেই আমদানিকারকরা বুঝতে পেরেছিল ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেবে। যে কারণে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই আমদানিকরকরা চীন, মিসর, মিয়ানমার, পাকিস্তান, তুরস্ক ও নেদারল্যান্ডস থেকে পেঁয়াজ আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করে। এ সব দেশ থেকে প্রথম পর্যায়ে কিছু পেঁয়াজ জাহাজীকরণ করা হয়েছে, যা এ সপ্তাহের মধ্যেই দেশের বাজারে ঢুকবে। পর্যায়ক্রমে আরও পেঁয়াজ আসতে থাকবে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের উপপরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, এবার যারা পেঁয়াজ নিয়ে নৈরাজ্য করেছে তাদের ধরতে মাঠে নেমেছি। পাইকারি থেকে শুরু করে খুচরা এমনকি আমদানি পর্যায়ে অভিযান পরিচালনা করছি। কয়েকদিনের মধ্যেই দোষীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা হবে।

এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পেঁয়াজের এলসি মার্জিন প্রত্যাহার করার সুপারিশ করেছে। এ বিষয়ে বুধবার অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রস্তাব বাংলাদেশে ব্যাংকে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে পেঁয়াজ আমদানি করতে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ মার্জিন দিতে হয়।

অর্থাৎ মোট এলসি মূল্যের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ অর্থ আমদানিকারককে দিতে হয়। বাকি অর্থ ব্যাংক দেয়। পেঁয়াজের দাম বাড়ায় এই মার্জিন প্রত্যাহার করার সুপারিশ করা হয়েছে। এটি প্রত্যাহার করা হলে ব্যাংক গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে পেঁয়াজ আমদানি করা যাবে। সেক্ষেত্রে মার্জিন অনেক কমে যাবে। মার্জিন ছাড়াই পুরো টাকা ব্যাংক থেকে দিয়েও পেঁয়াজ আমদানির সুযোগ তৈরি হবে। এতে আমদানির খরচ কমবে। ফলে বাজারে এর দাম কমাতেও সহায়ক হবে।