শুদ্ধি অভিযানের পর যুবলীগ নেতার নাম বদল

প্রকাশ: ২১ জানুয়ারী ২০২০ |

নিজস্ব প্রতিনিধি ■ বাংলাদেশ প্রেস

ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের কারণে নিজের নাম পর্যন্ত বদলে ফেলেছেন যুবলীগের এক নেতা। নতুন নামে তিনি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনী প্রচারণায় মাঠে নেমেছেন। আওয়ামী লীগ দলীয় মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চেয়ে সাঁটানো পোস্টার দেখে পরিচিত মহল তো হতবাক।

প্রথমে অনেকের ধারণা ছিল ভুলবশত হতে পারে। কিন্তু কৌতূহলী বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে নামলে যুগান্তরের হাতে চমকপ্রদ সব তথ্য আসতে থাকে। জানা গেল, ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান থেকে নিজেকে সুরক্ষা দিতে তিনি নামের অংশবিশেষ বদলে ফেলেছেন। প্রকৃত নাম আরমান হক বাবু।

তবে যুবলীগে তিনি কেরাঞ্চি বাবু নামে বেশি পরিচিত। সম্প্রতি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রভাবশালী এক প্রার্থীর পক্ষে ছাপানো পোস্টারে নিজেকে এরমান হক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। রাতারাতি নাম বদলানো এই নেতা বর্তমানে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক।

সূত্র জানায়, আরমান হক বাবু ওরফে কেরাঞ্চি বাবু বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের ঘনিষ্ঠভাজন ছিলেন। সম্রাটের আস্তানা হিসেবে পরিচিত কাকরাইলের ভুঁইয়া ম্যানশনের নিচতলায় তিনি ‘যুব জাগরণ সেন্টার’ নামে আরেকটি চাঁদাবাজির আখড়া গড়ে তোলেন।

ভুঁইফোড় এই সংগঠনের নামে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি করা হতো। এছাড়া আরেক বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা ক্যাসিনোর বড় কর্তা ছিলেন তিনি। ফকিরাপুলের অন্যতম ক্যাসিনো ইয়াংম্যানস ক্লাবের কমিটিতে তিনি কোষাধ্যক্ষ ছিলেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুবলীগ নেতা যুগান্তরকে বলেন, আরমান হক ওরফে বাবু ক্যাসিনো থেকে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক বনে গেছেন। ক্যাসিনো থেকে নির্ধারিত চাঁদার বাইরেও প্রতিরাতে তার লাখ লাখ টাকার আয় ছিল। কারণ বড় বড় জুয়াড়িদের চড়া সুদে তিনি টাকা ধার দিতেন।

মাত্র এক রাতের জন্য প্রতি লাখে ১০ হাজার টাকা সুদ নিতেন বাবু। এভাবে তিনি জুয়ার রাজ্যে অঢেল টাকা কামাইয়ের অভিনব পথ খোলেন। দীর্ঘ ৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে দুহাতে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা কামান। মাসে তার সর্বনিম্ন আয় ছিল অন্তত ১০ লাখ টাকা।

সূত্র বলছে, সম্রাটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে আরমান হক কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে ঠিকাদারিও করেন। মৎস্য ভবন, যুব ভবন ও রেলওয়ের বড় বড় কাজের টেন্ডার বাবুর নিয়ন্ত্রণে। অবৈধ টাকায় তিনি চড়েন প্রিমিও গাড়িতে, শাহজাহানপুরসহ রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় একাধিক বাড়ি ও ফ্ল্যাট কিনেছেন বলে জানা গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দক্ষিণ যুবলীগের এক নেতা বলেন, শুদ্ধি অভিযানের পর গা ঢাকা দেন বাবু। দীর্ঘ সময় আড়ালে থাকার পর পরিস্থিতি কিছুটা অনুকূল হওয়ায় তিনি ফের রাজনীতির মাঠে ফিরেছেন।

ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রচার-প্রচারণায় তাকে সক্রিয় দেখা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ দলীয় মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চেয়ে দেয়ালে পোস্টার সাঁটানো হচ্ছে আরমানের নতুন নামে।

সূত্র বলছে, রাজধানীর অলিগলিতে ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট ও খালেদের ছবিসহ অসংখ্য পোস্টারে সৌজন্য প্রচারক হিসেবে আরমান হক বাবুর নাম লেখা থাকত। সম্রাটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রমাণ হিসেবে নিজের ফেসবুক পেইজে অসংখ ছবিও দেন। কিন্তু সম্রাট ও খালেদ গ্রেফতার হলে সেসব ছবি মুছে ফেলা হয়।

এখন নতুন করে তিনি যেসব পোস্টার লাগাচ্ছেন তাতে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপস, যুবলীগের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান ও সাধারণ সম্পাদকের ছবি দেখা যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিজেকে একজন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিএস) বলেও পরিচয় দেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আরমান হক বাবু কথায় কথায় নিজেকে একজন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ বলে পরিচয় দেন। অথচ এ সংক্রান্ত কোনো ডিগ্রি তার নেই। তিনি মূলত মাদ্রাসা থেকে আলিম পাস করেন। কাকরাইলে সম্রাটের অফিসে আগে তিনি ফুটফরমায়েশ খাটতেন।

গত সংসদ নির্বাচনে সম্রাট ভোটে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিলে তার পক্ষে পোস্টার লাগানো শুরু করেন আরমান। সম্রাটের গুণগান সংবলিত গান লেখা ও রেকর্ড থেকে শুরু করে ব্যাপক প্রচারণার দায়িত্ব ছিল তার। সম্রাট ছাড়াও যুবলীগের সাবেক চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর ব্যক্তিগত কাজকর্ম দেখভাল করতেন।

এ কারণে তাকে দক্ষিণ যুবলীগের কমিটিতে প্রচার প্রকাশনা সম্পাদকের পদ দেয়া হয়। তবে নেতা হওয়ার পর তার চাঁদাবাজি আরও বাড়ে। তুচ্ছ ঘটনায় বড় ধরনের গোলমাল বাধানোর বদঅভ্যাসের কারণে যুবলীগের নেতাকর্মীদের কাছে তিনি কেরাঞ্চি বাবু নামে পরিচিতি পান।

হঠাৎ নাম পরিবর্তনের কারণ জানতে চাইলে আরমান হক বাবু শনিবার সন্ধ্যায় বলেন, ‘শুদ্ধি অভিযান বা ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের পর নাম পরিবর্তনের অভিযোগটি মোটেও সত্যি নয়। আমার নাম আসলে এরমান হক। মহানগর দক্ষিণের কমিটি করার সময় নামের বানানে ভুল হয়ে যায়।

এটা সংশোধনের জন্য আমি অনেকদিন ধরেই চেষ্টা করছিলাম। এখন যেহেতু দল থেকে নতুন করে জীবন বৃত্তান্ত চাওয়া হচ্ছে তাই নামটা পরিবর্তন করে সঠিকটা দিয়েছি।’ যুব জাগরণ সেন্টারের নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘এটা ভিত্তিহীন। প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হিসেবে আমার যে দায়িত্ব সেটাই পালন করেছি।

বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট ও খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া আমাদের নেতা ছিলেন। তাই তাদের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছি। এর বাইরে অন্য কোনো সম্পর্ক বা বিশেষ ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ সত্য নয়। আমার ঠিকাদারি লাইসেন্স রয়েছে। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে আমি ঠিকাদারির সঙ্গে যুক্ত আছি।’

এদিকে তিনি নিজেকে এরমান বলে দাবি করলেও তার ভ্যারিফাইড ফেসবুক পেজে এখনও তার নাম স্পষ্টভাবে লেখা আছে আরমান হক বাবু। এতেই প্রমাণিত হয়, তিনি ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্যে সম্প্রতি তার নিজের নাম আংশিক পরিবর্তন করে সিটি নির্বাচনে একজন মেয়রের পক্ষে প্রচার-প্রচারণায় নেমেছেন।