আবার লুটের পাঁয়তারা!

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০১৯

নিজস্ব প্রতিনিধি ■ বাংলাদেশ প্রেস

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিভিন্ন ভবন নির্মাণ ও আসবাবপত্র কেনায় সীমাহীন দুর্নীতির দায়ে অনেকে চাকরি থেকে বরখাস্ত হয়েছেন। তার রেশ না কাটতেই সেই বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা ও তদারকি করতে আবারো প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এতে ১০ তলা বিল্ডিং নির্মাণ ও বিভিন্ন আসবাবপত্র কেনা হবে। এ প্রকল্পে তিনশ জনকে অত্যধিক ব্যয়ে বিদেশ ভ্রমণ ও প্রশিক্ষণে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিশাল ব্যয়ে পরামর্শক সেবা নিতে অনুমোদনের তিন বছর আগেই চুক্তি করা হয়েছে।

শুধু তাই নয়, সব বিল্ডিং পাশাপাশি হলেও আলাদাভাবে বাউন্ডারি ওয়ালসহ বিভিন্ন খাতেও অনেক ব্যয় ধরা হয়েছে। এভাবেই বিভিন্ন খাতে অপ্রাসঙ্গিক ও ভুতুড়ে ব্যয় ধরা হয়েছে। এতে বাধ্য হয়ে পরিকল্পনা কমিশন আপত্তি ও প্রশ্ন করেছে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পারমাণবিক নিরাপত্তা তদারকিকরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের নিউক্লিয়ার রেগুলেটরি ইনফ্রাস্ট্রাকচার উন্নয়ন প্রকল্পের এই চিত্র।

আইএমইডি বলেছে বিভিন্ন পণ্য কেনার যে প্রস্তাব করা হয়েছে তাতে কোয়ানটিটি, কোয়ালিটি ও টাইম বিবেচনা করা হয়নি। এ জন্য প্রকল্পের মনিটরিং করা দুরূহ হবে। প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি ২০২৫ সালে বাস্তবায়ন করবে গণপূর্ত অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ (বিএইআরএ)।

এত কিছুর পরও বিভিন্ন প্রকল্পে বাড়তি ও অযৌক্তিক ব্যয় প্রাক্কলন কেন- এমন প্রশ্নের ব্যাপারে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান আমার সংবাদকে বলেন, সব মন্ত্রণালয়কে সব কিছু ঠিকঠাক করে প্রকল্প আনার জন্য বলা হচ্ছে পরিকল্পনা কমিশন থেকে। তারপরও তারা বেশি ব্যয় দেখাবে তা কাম্য নয়। এটা দুঃখজনক। যদি যাচাই করে দেখা যায় অনেক বেশি ব্যয় ধরা হয়েছে তাহলে কমানো হয়। বাস্তবায়ন পরীবিক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) সচিবকেও দায়িত্ব দেয়া হয়েছে যাতে কোনোক্রমেই বেশি ব্যয় বা অযৌক্তিক ব্যয়ে কোনো প্রকল্প অনুমোদন না হয়।

যোগাযোগ করা হলে আইএমইডি সচিব আবুল মনসুর মো. উয়েজউল্লাহ এ ব্যাপারে বলেন, সব প্রকল্পের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) সভায় সবকিছু দেখা হচ্ছে। তা নতুন বা সংশোধন করার ক্ষেত্রে হোক। কাজেই কোনো মন্ত্রণালয় বেশি অর্থ প্রাক্কলন করে চাইলেও ইচ্ছামতো ব্যয় করতে পারবে না।

এ ব্যাপারে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান আমার সংবাদকে জানান, পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্প অনুমোদনের আগে অযৌক্তিক ব্যয়ের ব্যাপারে আপত্তি করে সংশোধন করতে বলে, এটা যৌক্তিক। এ প্রকল্পে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বিভিন্ন খাতে যেভাবে বেশি ব্যয় দেখিয়েছে তা ঠিক করেনি। এটা খুবই নেতিবাচক দিক, উন্নয়ন কাজের অন্তরায়। এভাবে

যৌক্তিক ব্যয়ের প্রকল্পের অনুমোদন কখনো হতে পারে না। যারা এভাবে বেশি ব্যয় প্রাক্কলন করেছে তাদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা উচিত। এটা করা হলে কাজের মধ্যে স্বচ্ছতা আসবে এবং সঠিক সময়ে ভালো কাজ হবে। মন্ত্রণালয়কে এটা নিশ্চিত করতে হবে।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা কমিশনসহ একাধিক সূত্র জানায়, প্রায় আটশ বিঘা জমিতে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেকর্ড এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। এতে ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। তাতে রাশিয়ার ঋণই হচ্ছে ৯৩ হাজার কোটি টাকা। বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে রাশিয়া ও ভারতের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে এ বিশাল কর্মযজ্ঞের কাজ শুরু হয়েছে ২০১৬ সালে। পাবনার রূপপুরে সবচেয়ে বড় এই বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়নের সাথে জড়িত শীর্ষ কর্মকর্তাদের বসবাসের জন্য প্রায় একশ বিঘা জমিতে গ্রিন সিটি করা হয়েছে। কিন্তু সেই কাজেই ঘটেছে তুঘলকি কাণ্ড। অনিয়ম ও দুর্নীতির সীমা ছাড়িয়ে গেছে। প্রকল্পটি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ (বিএইআরএ) ও গণপূর্ত অধিদপ্তর বাস্তবায়ন করছে। এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলে সরকার আমলে নিয়ে জড়িতদের মধ্যে ৩৪ জনকে বরখাস্ত করা হয়েছে। দুদকও তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত কাজ শুরু করেছে। প্রকৃত সত্য জানতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

সেই তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম জানান, রূপপুর পারমাণবিক বিদু্যুৎকেন্দ্রের গ্রিন সিটি আবাসনে দুর্নীতিতে ৩৪ জন জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। জড়িতদের মধ্যে চারজন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের, বাকিরা গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের।

সূত্র আরও জানায়, গ্রিন সিটিতে বিভিন্ন বিল্ডিং নির্মাণ ও আসবাবপত্র কেনা হয়। তারপরও কর্মকর্তাদের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। এ জন্য আরও আবাসন দরকার। এছাড়া কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় প্রধান অফিসে জায়গাও দরকার। এ জন্যই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এই প্রকল্পটি হাতে নিয়েছে। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থে এই প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৭৫১ কোটি টাকা। ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এটি বাস্তবায়ন করা হবে। এই প্রকল্প তৈরি করে অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে তা যাচাই করতে ২১ আগস্ট পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় এই প্রকল্পে বিভিন্ন অসঙ্গতি ধরা পড়ে। শুধু তাই নয়, প্রকল্পের বিভিন্ন আইটেমে বাড়তি ব্যয়ের ব্যাপারে সভায় আপত্তি করে তা সংশোধন করতে বলা হয়েছে।

সভায় আপত্তি জানিয়ে পরিকল্পনা কমিশন থেকে বলা হয়েছে, সাধারণত প্রকল্প অনুমোদনের পর পরামর্শক সেবা নেয়ার জন্য চুক্তি করা হয়। কিন্তু এ প্রকল্পে তিন বছর আগেই প্রকল্প গ্রহণের আগেই ভারত ও রাশিয়ার সঙ্গে এই চুক্তি কেন? বাধ্য হয়ে এর বাখ্যা চেয়েছে। বিএইআরএর প্রধান কার্যালয়ে ১০ তলা ভবন নির্মাণ এবং ফার্নিচার, ফায়ারপ্রুভ ডকুমেন্টেশন রুমসহ বিভিন্ন খাতে যে ব্যয় ধরা হয়েছে তা সুনির্দিষ্ট করা হয়নি। তাই এসব ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।

শুধু তাই নয়, রূপপুরে অসংখ্য ভবন থাকার পরও কেন তিনটি ভবন নির্মাণ, এর প্রয়োজনীয়তা কি। ওই বিল্ডিংগুলো পাশাপাশি একই জায়গায় করা হলেও অনেক টাকা ব্যয়ে আলাদাভাবে বাউন্ডারি ওয়াল, অ্যাপ্রোচ সড়ক, সুয়ারেজ সিস্টেম, ওয়াকওয়ে, কম্পাউন্ড লাইটিং, ব্রডব্যান্ড লাইন কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। তাই পরিকল্পনা কমিশন সাফ জানিয়ে দিয়েছে এসব আলাদাভাবে করা হবে কেন? ৪ বছর থেকে ১৫ দিনের জন্য তিনশ জনকে দেশ-বিদেশে প্রশিক্ষণ এবং ভ্রমণের ব্যবস্থা করা হলেও কারা কোন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেবেন তার উল্লেখ করা হয়নি। অথচ শুধু বিদেশ ভ্রমণেই ১২ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। যা খুবই বেশি। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কেনার ক্ষেত্রে এলটিএম পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে, যা অযৌক্তিক।

এছাড়া বিভিন্ন সফটওয়্যার কেনার ক্ষেত্রেও আলাদাভাবে কিছু উল্লেখ করা হয়নি। এভাবেই প্রকল্পের প্রায় খাতে (অঙ্গ) বেশি ও অযৌক্তিকভাবে ব্যয় নির্ধারণ করায় পরিকল্পনা কমিশন থেকে সভায় আপত্তি করে তা সংশোধন করতে বলা হয়েছে। বাস্তবায়ন, পরীবিক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) বলেছে, কোয়ানটিটি, কোয়ালিটি ও টাইম বিবেচনায় আনা হয়নি। তাই যথাযথভাবে প্রকল্পটি মনিটরিং করা সম্ভব হবে না।

সার্বিক ব্যাপারে জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট সদস্য (সচিব) আবুল কালাম আজাদ এ প্রতিবেদককে বলেন, পিইসি সভায় অনেক ব্যাপারে অসঙ্গতি ধরা পড়ায় তা সংশোধন করতে বলা হয়েছে। সংশোধন করে প্রকল্প উন্নয়ন প্রস্তাব (ডিপিপি) জমা দিলেই তা অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে। আর জমা না দিলে হবে না।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সব প্রকল্পই নিয়ম মেনে অনুমোদনের উপস্থাপন করা হয়। লাইনমিনিস্ট্রি (সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়) ভুল করলে তার খেসারত তাদেরই দিতে হয়।

কারণ অনেকেই প্রকল্প নিয়ে এলেও বেশি মাত্রায় ভুল থাকলে পিইসি সভায় তা ধরা পড়ে। কোনোটা একেবারে বেশি ভুল মনে হলে ফেরত দেয়া হয়। কোনোটা বিভিন্নভাবে যাচাই করে সংশোধন করতে বলা হয়। কেউ সংশোধন করে প্রকল্প জমা না দিলে তা আর একনেক সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয় না। কাজেই অনুমোদনও হয় না।

উল্লেখ্য, স্বপ্নের সেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবে রূপ দিতে ২০১০ সালের ১০ নভেম্বর জাতীয় সংসদে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। এরপর বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে ২০১৬ সালে রাশিয়ার সঙ্গে ঋণ চুক্তি হয়। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেই প্রথম পর্যায়ে ২০২৩ সালে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে।