কৃষি ও পরিবেশ

পানির দামে সবজি বিক্রিতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষক

প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২০ |

নিজস্ব প্রতিনিধি ■ বাংলাদেশ প্রেস

দেশের অন্যতম বৃহৎ সবজির বাজার যশোরের সাতমাইল হাট। জেলার বিভিন্ন এলাকার চাষীরা তাদের উৎপাদিত সবজি নিয়ে প্রতি রবি ও বৃহস্পতিবার এ হাটে আসেন। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানের পাইকারি ব্যবসায়ীরা এখান থেকে সবজি কিনে ট্রাকযোগে নিয়ে যান। কিন্তু নভেল করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়েছে এখানেও। করোনাভাইরাস আতঙ্কে পাইকাররা হাটে আসছেন না। হাটে পাইকার না থাকায় গতকাল পানির দামে সবজি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা। 

সদর উপজেলার নাটুয়াপাড়া গ্রামের আলী হোসেন বলেন, এবার ১৪ কাঠা জমিতে পটোলের আবাদ করেছিলাম। গতকাল হাটে পটোল বিক্রি করেছি ২৮ টাকা কেজিতে। অথচ এক কেজি পটোল উৎপাদনে খরচ হয় ২৮-৩০ টাকা। 

চূড়ামনকাঠির বিজয়নগরের কৃষক আহাদ বলেন, মুলা ১৮ টাকা কেজিতে বিক্রি করলাম। ৩৫ টাকা বিক্রি হলে আমাদের লোকসান হতো না। কিন্তু কী করব হাটে পাইকাররা না আসায় স্থানীয় ব্যাপারীরা দাম দিতে চাইছেন না। 

বড় হৈবত্পুর গ্রামের চাষী মোহর আলী বলেন, পটোল ২৮ টাকা, উচ্ছে ৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি করে লোকসান দিতে হলো। 

একই গ্রামের শুকুর আলী বলেন, বাঁধাকপি, ৬ টাকা পিস, লাউ ১০-১২ টাকা পিস, বেগুন ৮ টাকা কেজি, ঢেঁড়স ১০ টাকা ও শিম ১০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এতে আমাদের পুঁজি বাঁচবে না। কিন্তু কী করব, সবজি না বিক্রি করলে তো নষ্ট হয়ে যাবে। 

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার ব্যাপারী আনোয়ার হোসেন জানান, গত রোববার হাটে পরিবহন খরচসহ পটোল ৩২ টাকা কেজিতে কিনে ঢাকার কেরানীগঞ্জে ২৫ টাকা কেজিতে বিক্রি করতে হয়েছিল। বড় পাইকাররা দাম দিচ্ছেন না। 

স্থানীয় ব্যাপারী আবদুর রহমান বলেন, আগে ঢাকায় যেতে ট্রাকভাড়া লাগত ১৩-১৪ হাজার টাকা কিন্তু এখন ভাড়া নিচ্ছে ১৮ হাজার টাকা। এতে পণ্যের দাম বেশি পড়লেও আমরা ঢাকায় সবজি নিয়ে দাম পাচ্ছি না।

শাক-সবজি উৎপাদনে হেক্টরপ্রতি গড় ফলন সর্বোচ্চ ও দেশের সবজির চাহিদা পূরণে বিশেষ অবদান রাখায় জেলা পর্যায়ে প্রথম হয়েছে যশোর। সম্প্রতি ঢাকায় শেষ হওয়া জাতীয় কৃষি মেলা শেষে এ স্বীকৃতি দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়।

যশোর জেলায় মোট ৩৩ ধরনের সবজি উৎপাদন হয়ে থাকে। বছরে ৩২ হাজার হেক্টর জমিতে চাষীরা বিভিন্ন ধরনের সবজির আবাদ করেন, যা থেকে উৎপাদন হয় প্রায় আট লাখ টন। এসব সবজি জেলার চাহিদা মিটিয়ে ঢাকাসহ সারা দেশে গিয়ে থাকে।

যশোর আঞ্চলিক কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে জেলায় সবজির আবাদ করা হয় ২৮ হাজার ৬৩৫ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন হয়েছিল ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৫১০ টন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আবাদ করা হয় ২৭ হাজার ১৮২ হেক্টর। উৎপাদন হয় ৫ লাখ ১৪ হাজার ১৫৯ টন। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সবজির আবাদ হয়েছিল ২৯ হাজার ৭৪০ হেক্টরে, সবজি উৎপাদন হয়েছিল ৬ লাখ ২ হাজার ১১৮ টন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আবাদ করা হয় ৩০ হাজার ১৭৫ হেক্টরে, উৎপাদন হয়েছিল ৬ লাখ ৬৬ হাজার ২৬৫ টন। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আবাদ করা হয়েছিল ৩২ হাজার ৪৭০ হেক্টর জমিতে, যা থেকে সবজি উৎপাদন হয়েছিল ৮ লাখ ৭ হাজার ৭৪১ টন। 

যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় সবজি চাষ হয়েছে ১৬ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে। বছরে দুবার সবজি আবাদ হয়। এর মধ্যে যশোর সদরে ২ হাজার ৩১৫ হেক্টর, শার্শায় ১ হাজার ৬৯৫, ঝিকরগাছায় ২ হাজার ১০, চৌগাছায় ৪ হাজার ২৫০, কেশবপুরে ১ হাজার ১০, মণিরামপুরে ২ হাজার ২৫০, অভয়নগরে ৫৫০ ও বাঘারপাড়ায় ৮৮০ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ হয়। 

এ বিষয়ে যশোর আঞ্চলিক কৃষি অফিসের উপপরিচালক ড. আক্তারুজ্জামান বলেন, যশোরে সারা বছর সবজির আবাদ হয়। জেলায় গড়ে আট হাজার টনেরও বেশি সবজি উৎপাদন হয়। প্রতি হেক্টরে গড়ে ২৩-২৫ টন করে সবজি উৎপাদন হয়। সম্প্রতি কৃষি বিভাগ সবজি উৎপাদনে যশোরকে প্রথম ঘোষণা করেছে। কিন্তু দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর বন্ধ রয়েছে গণপরিবহন চলাচল। করোনাভাইরাস আতঙ্কে হাটবাজারেও মানুষ কম যাচ্ছে। এজন্য দেশে গড় সবজির চাহিদা কমে গেছে। এজন্য পাইকাররা বাজার থেকে সবজি কিনতে চাচ্ছেন না। কিন্তু অধিকাংশ সবজিই পচনশীল। তাই চাইলেও সংরক্ষণ করে রাখা সম্ভব হবে না। এজন্য লোকসান দিয়েই বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন চাষীরা।